মনিরুজ্জামান লাভলু।।
“বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ কেড়ে নিয়েছে আবেগ”। কিন্তু আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের বেগ ও আবেগ দুটোই ছিল। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, সমাজসেবী, শিল্প উদ্যোক্তা, বিদ্যাৎসাহী ও সাহিত্য অনুরাগী ছিলেন। প্রফুল্ল চন্দ্র রায় খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে রাডুলি গ্রামে ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন, বছরটি রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় কেননা ঐ বছর বিজ্ঞানী ক্রুকস ’থলিয়াম’ আবিষ্কার করেছিলেন। আরেকটি কারণেও ১৮৬১ সাল প্রতিটি বাঙালির কাছে স্মরণীয়। কেননা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই বছর জন্মগ্রহণ করেন। প্রফুল্ল চন্দ্রের মাতা ছিলেন ভুবনমোহিনী দেবী। পিতা হরিশচন্দ্র রায়।
হরিশচন্দ্র রায় একজন মৌলভী সাহেব নিযুক্ত করে খুব ভালোভাবে ফার্সি শিখেছিলেন। তিনি কিছু আরবীও জানতেন। হরিশচন্দ্র অনেক সময় বলতেন যে, যদিও তিনি এক গোড়া হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তবুও তার মনন তৈরি হয়েছে ফার্সি কবি হাফিজের ‘দিওয়ান’ পড়ে। পিতার কাছ থেকে প্রফুল্ল চন্দ্র যে সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক উদার দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছিলেন তাই তাঁর সারাজীবনে বৈশিষ্ট্য ছিল।
প্রফুল্ল চন্দ্রের পূর্বপুরুষরা সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় তাঁর কাছ থেকে কয়েকটি গ্রামের দান পেয়ে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে এসেছিলেন। ব্রিটিশ আমলে প্রপিতামহ মানিক লাল রায় নদিয়া- যশোরের কালেক্টরের দেওয়ান নিযুক্ত হয়েছিলেন। পিতা হরিশচন্দ্রের ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি পুত্র প্রফুল্লচন্দ্রকে ‘নোভান অর্গানাম’ পড়ে শুনিয়েছিলেন। প্রফুল্ল চন্দ্র গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন। ১৮৭০ সালে তিনি প্রথম কলকাতা আসেন। প্রথমে তিনি কলকাতায় হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে প্রিয় বিষয় ছিল ইতিহাস ও ভূগোল এবং এই দুই বিষয়েই তিনি পরীক্ষায় পুরো নম্বর পেতেন। ইংরেজি সাহিত্য নিয়েও তিনি এ সময় প্রচুর পড়াশুনা করেছেন। বিশেষ করে মনীষীদের জীবনী তাঁকে আকর্ষণ করত সবচেয়ে বেশি।বাল্য বয়সেই তিনি বিজ্ঞানী নিউটন ও গ্যালিলিও’র জীবনী পড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় ১৮৭৪ সালে যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বছর, তখন তাঁকে প্রচন্ড রকমের রক্ত আমাশয় রোগে আক্রমণ করে। পরে স্কুল পরিত্যাগ করে ঘরে বসেই তিনি লেখাপড়া শুরু করেন। এই সময়ে তিনি নিজে নিজেই ল্যাটিন ভাষা শেখা শুরু করে দেন এবং কিছুটা ল্যাটিন ভাষা রপ্ত করার ফলে ফার্সি শেখাও তাঁর পক্ষে আর কষ্টকর হলো না।
স্বাস্থ্য কিছুটা ভালো হওয়ার পর এলবার্ট স্কুলে ভর্তি হন। তিনি এলবার্ট স্কুল থেকে হেয়ার স্কুলে ফিরে যেতে চাইলেও তাঁর স্কুলের শিক্ষকরা তাঁর আচরণে মুগ্ধ হয়ে ফিরে যেতে দেননি। অ্যালবার্ট স্কুল থেকেই প্রফুল্ল চন্দ্র এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। ইংরেজি ছাড়াও ব্যাচেলর অফ আর্টস পরীক্ষার জন্য রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান নিয়েছিলেন। বিজ্ঞানের বিষয় দুটি তাঁকে প্রেসিডেন্সি কলেজে বহিরাগত ছাত্র হিসেবে পড়তে হতো। সেখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন স্যার আলেকজান্ডার পেডলার যিনি তাঁকে রসায়নে পরীক্ষণের দিকে আকৃষ্ট করে তোলেন।
এই সময় তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য গোপনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তিনি মেধার বলে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় বিএসসিতে ভর্তি হন। তাঁর পঠিত বিষয় ছিল রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যা। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে সক্ষম হলেন যে, রসায়ন তাঁর প্রধান আকর্ষণ।
যথাসময়ে প্রফুল্ল চন্দ্র রসায়নশাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান সম্বলিত একটি প্রবন্ধ পরীক্ষার জন্য উপস্থাপন করেন এবং তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রী প্রদান করা হয়। সিলেবাস ভিত্তিক পাঠ সমাপ্ত করেও আরো জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি এডিনবরায় থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন । এ সময় তাঁকে ’হোপ পুরস্কার’ বৃত্তি প্রদান করা হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন সমিতির সহ-সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। সভাপতি ছিলেন বিজ্ঞানী ক্রাম ব্রাউন। ১৮৮৮ সালের আগস্ট মাসে প্রফুল্ল চন্দ্র ঠিক ছয় বছর পরে দেশে ফিরে আসেন। রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য তিনি গভর্নরের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। প্রায় এক বছর তাঁর কোন চাকরি ছিল না এবং বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর গৃহে তিনি অতিথি হিসেবে জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ব্রিটিশ সরকার মাসিক আড়াইশো টাকা বেতনের একটি পদে নিয়োগ দান করেন, যা’ অবশ্য পরে ভারত সচিব এর অনুভূতি ক্রমে উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। এভাবে প্রফুল্ল চন্দ্র ১৮৮৯ সালের জুলাই মাসে অধ্যাপক হিসেবে প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগদান করেন। ধীরে ধীরে শিক্ষকতার সঙ্গে তিনি গবেষণার কাজও শুরু করেন। ১৮৯৪ সালের জুলাই মাসে তাঁরই দেয়া নকশায় প্রেসিডেন্সি কলেজের নতুন রসায়নবিজ্ঞান ভবন তৈরি হয় এবং এখানে ১৮৯৫ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর বিজ্ঞানের বিখ্যাত সৃষ্টি “মারকিউরাস নাইট্রাইট” আবিষ্কার করেন। তিনি তার সমগ্র জীবনে ১২ টি যৌগিক লবণ ও ৫টি থায়োস্টার আবিষ্কার করেন।
তাঁর আবিষ্কার সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন, “পারদের উপর শীতল অবস্থায় ডাইলিউট নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে মারকিউরাস নাইট্রেট বেশি করে তৈরি করার সময় একটা হলুদ কেলাসিত বস্তুর উদ্ভব দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। প্রথমে এটা একটি বেসিক সল্ট বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু জোরালো এসিড দ্রবণে এ ধরণের লবণের উদ্ভব সাধারণ অভিজ্ঞতার বাইরে। প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হলো যে, এটি একটি মারকিউরাস সল্ট এবং নাইট্রেটও। সুতরাং এই উল্লেখযোগ্য যৌগটি নিয়ে গবেষণা করলে ভালই ফল পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হলো”। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের এ ধারণা যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। কালক্রমে তিনি নাইট্রেট সমূহের উপর একজন স্বীকৃত অথরিটি হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর গবেষণার জন্যই নাইট্রাইট যৌগ যে অস্থিতিশীল বস্তু নয় রসায়নবিদ্যা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।
স্যার এপিসি রায় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সহকর্মীও ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বিখ্যাত ফরাসি রসায়নবিদ এম. বেরথেলোর যোগাযোগ হয় এবং ভারতীয় রসায়নের ব্যাপারে তাঁর এক প্রশ্নের উত্তরে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র তাঁর জীবনের আরেকটি মনুমেন্টাল কাজ “হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি” রচনা শুরু করেন। এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর পৃথিবীর অনেক পন্ডিত তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ১৯১২ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রফুল্লচন্দ্রকে সম্মানজনক ’ডি. এসসি’ ডিগ্রী প্রদান করার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন যে, “তাঁর খ্যাতি প্রধানত এই গ্রন্থের মাধ্যমেই”। গ্রন্থটি রসায়নশাস্ত্রের উপর চূড়ান্ত গবেষণামূলক অবদান।
আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, এই গ্রন্থ যখন তিনি রচনা করেছিলেন তখনই তিনি তাঁর জীবনের আর একটি বিখ্যাত কাজ “বেঙ্গল কেমিকাল অ্যান্ড ফার্মাসিটিক্যালস ওয়ার্কস” শুরু করেন। ইউরোপে থাকার সময় তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, শিল্প এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি চলে। ইউরোপ এবং আমেরিকায় শিল্পের বিপুল উন্নতির ইতিহাস আসলে বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারগুলিরই গৌরবের ইতিহাস। কিন্তু এই উপমহাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত যুবকের কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার উদ্যোগ দেখা যায় না। এই চিন্তা চেতনা থেকে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রথমে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি করার চিন্তা করেন। কেননা এই এসিডটি হল শিল্পের জননী। তিনি ভারতের প্রথম শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা। ১৮৯২ সালে ৭০০/- টাকা বিনিয়োগে ও নিজ উদ্যোগে নিজস্ব গবেষণাগারে ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯০১ সালে কারখানাটি কলকাতার মানিক তলায় ৪৫.০০ একর জমিতে স্থানান্তরিত করা হয় তখন এর নতুন নাম নাম রাখা হয় “বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড”। ‘খুলনা টেক্সটাইল মিলস’ও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। নিজের জন্য মাসিক ৪০ টাকার রেখে বাকি টাকা তিনি জমিয়ে রাখতেন। ১৯২৬ সাল থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা দান করেন। তিনি একমাত্র অধ্যাপক ষিনি অধ্যাপনায় বাংলা ব্যবহার করতেন। তিনি ছিলেন বিদ্বানুরাগী। অনেক সমাজ হিতৈষী কাজ তিনি করেছেন। তন্মধ্যে বাগেরহাট পিসি কলেজ প্রতিষ্ঠা অন্যতম। মায়ের জোগাড় করা কিছু টাকা দিয়ে তিনি ১৯১৮ সালে এই কলেজ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখেন। বাগেরহাটবাসী তাঁকে ইতিহাসের পাতায় চিরঞ্জীব করে রাখার জন্য এই কলেজের নাম রাখেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ। কলেজটি পরবর্তীতে জাতীয়করণ হয়। এই কলেজ অনেক কৃতিধর মানব ধারণ করেছে। তন্মধ্যে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ অন্যতম। বিজ্ঞানী পিসি রায় ১৯০৩ সালে তার পিতার নামে আর.কে. বি. কে হরিশচন্দ্র স্কুল, ১৯০৯ সালে নিজ জন্মভূমিতে একটি কোঅপারেটিভ ব্যাংক । ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধি দেন। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক তাঁর ছাত্র ছিলেন।
স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায় জীবনের অধিক সময় তাঁর ল্যাবরেটরিতে একটি ঘরে চিরকুমারের জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি সাদাসিধে জীবন-যাপন করতেন। খদ্দর পড়তেন, খাটো করে ধূতি পরতেন। এই সৌম্যকান্তি ঋষি ১৯৪৪ সালের ১৯ জুন বিজ্ঞান কলেজেই মৃত্যুবরণ করেন। লেখক: কবি ও গবেষক
ধঁঃযড়ৎসড়হরৎ@মসধরষ.পড়স










































