Home কলাম চাই কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান

চাই কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান

29

বাপি সাহা
ভারত সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনার মাধ্যমে অনেকটা আটকে গেছে ভারত বাংলাদেশের বাণিজ্য। প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের জায়গায় যে আশার আলো দেখা যাচ্ছিল সেখানে আচমকা মেঘের তৈরি হয়েছে। যেটাই হোক না কেন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং এর কোন বিকল্প নেই। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বিরতির পরবর্তী পর্যায়ে হঠাৎ করে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের এই বাণিজ্য বিধিনিষেধ -এর প্রভাব ইতিমধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করছে। সীমান্তে ইতিমধ্যে পণ্য পরিবহন জট পড়তে শুরু করছে।

বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর( ইপিবি) হিসাবের দিকে তাকালে বোঝা যায় বাংলাদেশে ভারতের একটি বৃহৎতর বাজার এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। ভারতে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বাংলাদেশ মোট ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে আর ভারত থেকে বাংলাদেশে ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। এর বড় অংশ শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য। ভারতীয় ভোগ্য পণ্যের বড় বাজার বাংলাদেশ। ভারতের ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের দেশটির শীর্ষ ১০ রপ্তানি গন্তব্যের মধ্যে ভারত একটি। বিশ্লষণের মাধ্যমে দেখা গেছে এর অবস্থান বছরভেদে আটের আশে পাশে থাকে। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রে। এরই পরে রয়েছে জার্মানি,যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ফ্রান্স। এশিয়ার দেশ জাপান অথবা চীন বাংলাদেশের বিগত এক দশকে ভারত,চীন,জাপান,দক্ষিণ কোরিয়া,ব্রাজিল,নিউজিল্যান্ড,অষ্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি বেড়েছে। অবশ্য কোনো কোনো বাজারে আবার কোনো কোনো বছর কমেছে।
সরকার সকল সময় চায় ব্যবসায়ীরা যেন নতুন বাজার সৃষ্টি ও নতুন পণ্য রপ্তানি করতে পারে। সরকার এ বিষয়ে অনেক সহযোগিতা দিয়ে থাকে। পোশাকের বাইরে নতুন পণ্য হিসাবে ভাল করছিল প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য। বিশেষ করে ভারতে বাংলাদেশের বিস্কুট, চানাচুর,চিপস, ফ্রুট, কোমল পানীয় শর্ষের তেল, কেক ইত্যাদি পণ্য বেশ ভালো রপ্তানি হচ্ছিল বাংলাদেশের কোনো কোনো ব্রান্ড ভারতের স্থানীয় ব্র্যান্ড গুলোকে প্রতিযোগিতা ও নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ার ক্ষেত্রে পেছনে ফেলছিল। যেমন প্রাণ আরএফএল গ্রুপের “পটাটা’’বিস্কুট ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। স্থানীয় ব্যান্ডগুলোর তখন পটাটার মতো বিস্কুট তৈরি করা শুরু করে।

আমরা একটু বিশ্লেষণ করে দেখি যে বিধি নিষেধ আরোপ করেছে তাতে কয়েকটি দিক রয়েছে। ভারতের কোনো স্থলবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করতে পারবে না। রপ্তানি করা যাবে কলকাতার হলদিয়া বন্দর ও মুম্বাইয়ের নবসেবা বন্দর দিয়ে। নব সেবা বন্দরটি নাম জওহরলাল নেহেরু বন্দর। স্থল পথে পন্য পরিবহনে ক্ষেত্রে যে ব্যয় হয় তার থেকে বেশি ব্যয় সমুদ্র পথে বা নৌ-পথে এবং সময়ও কিন্তু অনেক বেশি লাগে যা রপ্তানি পণ্যের জন্য ঝুঁকি বহন করে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে শুল্ক স্টেশন ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য,পানীয়,আসবাবপত্র, প্লাষ্টিক পণ্য,সুতা ও সুতরি উপজাত ইত্যাদি রপ্তানি করা যাবে না। বিষয়টির মূল কথা হচ্ছে শুল্ক স্টেশন ও স্থলবন্দরের মতো অবকাঠামো থাকে না অন্য কোনো স্থানে । সেখানে শুধু শুল্ক সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকে। বিধি নিষেধের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ী শুল্ক স্টেশন দিয়েও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য,পানীয়,আসবাব,প্লাষ্টিক পণ্য,সুতা ও সুতার উপজাত ইত্যাদি রপ্তানি করা যাবে না।

যে ঘটনাটি তৈরি হচ্ছে সেটি হলো ভারতের যে বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি বিধি নিষেধ প্রদান করা হয়েছে সে সকল অঞ্চলগুলি সেভেন সিস্টার্স খ্যাত রাজ্যের মধ্যে অবস্থান। এই বন্দরগুলি দিয়ে রপ্তানি করাটা অর্থনৈতিকভাবে অনেক সাশ্রয়। এই অঞ্চলগুলির ভূমি কেন্দ্রিক। এই অঞ্চলে নৌ পথ বা সমুদ্র পথ ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। মনে করা হয়ে খাকে ভারত থেকে সূতা আমদানি ও চীনের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ার কারণে কি আমাদের জন্য এই পরিস্থিতি তৈরি সেটিও কিন্ত ভাবতে হবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকের তথ্যানুসারে,২০২৩-২৪অর্থ বছরে সার্কভূক্ত দেশগুলোয় বাংলাদেশ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশগুলোয় বাংলাদেশ ১৭৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে এসব দেশ থেকে আমদানি করেছে ৯৭৬ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য বাংলাদেশ এক অর্থবছরে যত পণ্য রপ্তানি করেছে, তার মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ সার্কভুক্ত দেশগুলোয় কমেছে। সার্কভুক্ত দেশে যেমন বাংলাদেশের রপ্তানি কম, তেমনি এই দেশগুলো থেকে আমদানিও কম। বাংলাদেশের মোট আমদানি পণ্যের ১৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ আসে সার্কভুক্ত দেশগুলোর থেকে। সার্ক ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য অসমতা রয়ে গেছে। ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের বাণিজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার আন্তবাণিজ্য বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়ন (সড়ক,রেল, বন্দর সংযোগ) একক কাষ্টমস ও সনদ প্রত্যয়ন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক সংলাপ এবং যৌথ শিল্প পার্ক বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা প্রয়োজন।

ইতিমধ্যে ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের যে বাজার সেই বাজার ক্ষতির মধ্যে পড়তে চলেছে। চট্টগ্রাম থেকে মুম্বাই হয়ে পোশাক রফতানি করাটা কিন্তু অনেকটা জটিল এবং ব্যয় সাপেক্ষ। খাদ্য দ্রব্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেটি ও কিন্তু ঝুঁকির মুখে। সীমান্তে বিধিনিষের কারণে অনেক পণ্যবাহী পরিবহন আটকে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে যে ভাবে হোক আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে। জোর কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। ২০ মে আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রনালয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারত -বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি ও বিজিএমই সহ অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্যোগও গ্রহন করেছে জরুরী ভাবে একটি চিঠিও প্রেরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ কিন্তু কোন বিধিনিষেধ আরোপ করেনি এটি কিন্তু একটি ভাল সিদ্ধান্ত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ নীতিমালায় পরিবর্তন বা স্থগিত হলেও এখানো পর্যন্ত সুখবর আসেনি। আমরা কিন্তু কোনো আলোচনাও শুরু করতে পারিনি যেটি আমাদের ব্যর্থতা। বিভিন্ন দেশের সাথে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সুইজারর‌্যান্ডের জেনেভায় একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারত উদ্যোগী হয়েছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করে সফলও হয়েছে শুল্ক ইস্যুতে।

অন্তর্বতী সরকারের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অনেক। তার মধ্যে সুষ্টু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরও কিন্তু বড় চাওয়া। অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রতি সম্মান রেখে বলছি প্রতিটি দেশ তার “অভ্যন্তরীণ ইন্টারেষ্ট’’ দেখে থাকে। প্রতিটি বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেও চুক্তি কিন্তু করেনি সেটির দৃষ্টি রাখতে হবে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যত দ্রুত সমস্যার সমাধান করা যাবে অন্য কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। থাইল্যান্ডে অনুষ্টিত বিমসটেক ( বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন ) সম্মেলনের সাইড লাইনে বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর যে বৈঠকটি হয়েছে সেটি কূটনৈতিক আলোচনার ফসল। অতএব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই কিন্তু সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করা।
লেখক: উন্নয়নকর্মী