শাহজাহান সিরাজ, কয়রা
আজ ২৫ মে,রবিবার। ২০০৯ সালের এই দিনে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলা সহ উপকূলবাসীর বিভিষীকাময় এক দুঃস্বপ্নের দিন। এদিন উপকূলীয় উপজেলা কয়রার উপর দিয়ে বয়ে যায় সবচেয়ে শক্তিশালি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস। যার নাম ছিল “আইলা”। এ ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড কয়ে দেয় গোটা উপকূলকে। প্রাণ হারান হাজার হাজার মানুষ। এক এক করে ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও ভাগ্য ফেরেনি অনেকের। সে দিনটির কথা আজও ভুলতে পারিনি উপকূল অঞ্চলের মানুষ। এই মাসেই ধেয়ে এসেছিল আইলা। তাই মে আসলে এখনও আতকে উঠেন বেঁচে যাওয়ারা। উপকূলের বাসিন্দারা এখনও সেই ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। আইলার কারনে সৃষ্টি হয়েছিল একটি শাখা নদী। যে কারনে বিঘার পর বিঘা জমি হারাতে হয়েছিল কয়রার বাসিন্দাদের।
ঝড়ে স্বজন হারানো মানুষের কান্না যেনো আজও শোনা যায়। বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সে কথা মনে করে আজও আতকে উঠেন। মহুর্তের মধ্যেই বিস্তীর্ন জনপদ যেন লণ্ড ভণ্ড হয়ে ধ্বংস লীলায় পরিণত হয়। কাঁদায় স্বজন হারা মানুষকে। মঠবাড়ী গ্রামের সঞ্জয় কুমার বলেন, সাত ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছাস হয়। মহুর্তেও মধ্যেই পানিতে ঘরবাড়ী তলিয়ে যায়।
সে ঝড়ের কথা কোন দিনই ভোলার নয়: সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া মোসলেম বলেন, ওই ঝড়ের সময় আমরা সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ায় কেউ ঝড়ের পূর্বাভাস পাইনি। যার ফলে এখানে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। ঝড় টি মহুর্তের মধ্যেই সব উপড়ে ফেলে দেয়। জেলেদের কয়েকশ নৌকা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
পবনায় রাস্তার উপর বসবাসকারী ফুলি বেগম বলেন, বইন্যায় সব তলায়া যায়, এমন বইন্যার কথা কি ভুলতে পারি।
প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে ১৬ বছর পরও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমউপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মান করা সম্ভব হয়নি। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মানের বেশ ২ টি মেগাপ্রকল্প সহ বেশ কিছু প্রকল্প নেওয়া হলেও সেসবের বাস্তবায়ন কাজ চলছে ধীরগতিতে। ফলে ওই অঞ্চলে দূর্যোগের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আবার এখন এমন এক ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্ক দানা বাঁধছে বাংলাদেশের আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসের পর বলা হয়েছে, চলতি মে মাসের শেষের দিকে আছড়ে পড়বে ঘূর্ণিঝড় শক্তি। এখন উপকূলে ঘূর্ণিঝড় শক্তির আঘাতের আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইলার সেই ক্ষত এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি উপকূলবাসী। তাতে মে মোস আসলেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে উপকূল মানুষের কপালে। কেননা মে মাসেই ধেয়ে এসেছিল আইলা, আম্পান ও মোখার মতো একের পর একপ্রাকৃতিক দূর্যোগ ঘূর্ণিঝড়।সুন্দরবনের উপকূলীয় জনপদে শুধু মে মাসেই গত ১৬ বছরে ১০ টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। তাই সুন্দরবন উপকূলীয় মানুষের কাছে আতঙ্কের মাস মে মাস। এবারও মে মাস শুরু হতেই “দূর্বল বাঁধ নিয়ে উৎকন্ঠায় সুন্দরবন সংলন উপকূলীয় কয়রা উপজেলার প্রায় তিন লক্ষ বাসিন্দা।
১৬ বছরে মে মাসে ১০ ঘূর্ণিঝড় হানা: সুুন্দরবনের উপকুলীয় জনপদে শুধু মে মাসেই গত ১৬ বছরে ১০ ি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা, ২০১৩ সালে ১ মে মহাসেন, ২০১৬ সালে ২ মে রোয়ানু, ২০১৭ সালে ৩০ মে মোরা, ২০১৯ সালে মে ফণী, ২০২০ সালে ২০ মে আম্ফান, ২০২১ সালে ২৬ মে ইয়াস, ২০২২ সালে ৭মে অশনি, ২০২৩ সালে ১৪ মে মোখা এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে ২৬ মে ঘূর্নিঝড় রেমালের আঘাতে সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
মঠবাড়ী এলাকাবাসী জানায়, ২০২৭ সালে ঘূর্নিঝড় সিডরের ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ২০০৯ সালে ২৫ মে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। প্রায় ৬/৭ বছর লেগে যায় সেই পানি নেমে যেতে। আইলার কারনে সৃষ্ট জলোচ্ছাসসে কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের পবনা এলাকায় নদীর বাঁধ ভেঙে মঠবাড়ী গ্রামকে দু’ভাগে বিভক্ত করে একটি শাখা নদী তৈরি হয়েছিল। ওই নদী শাকবাড়ীয়া খালের সাথে মিশেছে। আর চাষযোগ্য প্রায় তিনশ বিঘা জমি নদীতে পরিণত হয়। যে নদীর গভীরতা প্রায় ৩৫ ফুট। পবনার বাঁধ মেরামত হলেও শাকবাড়ীয়ায় ১৬ বছরেও বাঁধ নির্মাণ সম্ভব না হওয়ায় এখন ১৬০ মিটার দীর্ঘ নদীতে ভাসমান ড্রামের ভেলা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় এলাকাবাসীকে।
নদীর অপর পাড়ে প্রতাপ স্বরনী মাধ্যমিক বিদ্যালয় , দক্ষিণ মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কমিউিনিটি ক্লিনিক, কয়রা উত্তরচক কামিল মাদ্রাসা, কয়রা উত্তরচক মহিলা দাখিল মাদ্রাসা ও সুপেয় পানির পুকুর মূল এলাকা থেকে বিচ্ছিন্নি। অন্যপাড়ে কাশিয়াাদ ফরেষ্ট স্ঠেশন, প্রাচীন সুতির বাজার। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ফরেষ্ট স্টেশনে পাশ কাটা লোকজন, সুপেয় পানি কিংবা ক্লিনিকে সেবাগ্রহিতাদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হলো নৌকা । কিন্তু খেয়াপরাপারের জন্য কোন নৌকাও থাকে না।ফলে ঐ এলাকার হাজার হাজার মানুষের দূর্ভোগের কোন শেষ নেই।
এলাকাবাসী জানায়, নদীতে পড়ে যাওয়ার ঝুকির মধ্য দিয়েই অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীদের নদী পার হতে হচ্ছে ড্রাম দিয়ে বানানো সেই ভেলাতে করে। একদিকে নদী পার হওয়ার ঝুঁকি , অন্যদিকে চাষযোগ্য জমি, বসতবাড়ী, সহায়-সম্পদ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা এলাকাবাসী এখন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন কবে স্থায়ী বাঁধ মেরামত করা হবে সেই আশায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঝড়ের সময় শুরু হয় প্রাণ বাঁচাতে মানুষের দৌড়া-দৌড়ি, ছুটু-ছুটি। ঝড়ে কেউ হারিয়েছেন মা-বাবা, কেউ ভাই-বোন, কেউ বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম কষ্টে দিন অতিবাহিত করছেন। মানুষের আর্তনাদ যেন থামছে না।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুলী বিশ^াস বলেন, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা সমন্বয় সভায় আলোচনা করা হয়েছে। কীভাবে কী করা যায় সেটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
যে বেড়িবাঁধে বাড়ছে দুশ্চিন্তা: এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়রা সদর ইউনিয়নের কপোতাক্ষ, শাকবাড়ীয়া নদীর তীরবর্তী প্রায় ১ কিলোমিটার, মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ী, দশালিয়া ও হোগলা এলাকায় প্রায় ২ কিলোমিটার, উত্তরবেদকাশি ইউনিয়নের কাটকাটা থেকে শাকবাড়ীয়া গ্রাম পর্যন্ত ১ কিলোমিটার, কাটমারচর এলাকায় ১ কিলোমিটার, পাথরখালী এলাকায় ৬০০ মিটার, দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের আংটিহারা এলাকায় ৭০০ মিটার এবং মহেশ^রীপুর ইউনিয়নের শেখের কোনা, নয়ানি, তেতুলতলার চর, ও চৌকুনি এলাকায় ৩ কিলোমিটারের মতো বাঁধ ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীতে পানি বাড়লে ওই সব এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ ভেঙেও পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে।
শেষ মুহূর্তে মেরামতের উদ্যোগ: স্থানীয় বাসিন্দরা বলেন, বর্ষার আগমহুর্তে যখন নদীতে জোয়ারের পানি কানায় কানায় পূর্ণ হয়, কতৃপক্ষ সে সময় মেরামতের উদ্যোগ নেয়। নদীর পানি উপচে বেঁড়িবাঁধ না ভাঙা পর্যন্ত তারা কাজে হাত দেয় না। এতে একদিকে যেমন খরচ বাড়ে, তেমনি অন্যদিকেদ্রুতগতিতে কাজ করতে গিয়ে হয় নিম্মমানের। প্রায় সময় বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়।
মহারাজপুর ইউনিয়নের দশালিয়া গ্রামের আঃ আলিম বলেন, সময়ের কাজ সময়মতো বরলি আমাগে এত ভুগতি হয় না। গাঙের পানি যখন চরের নিচে থাকে ও শান্ত থাকে তখন কারও দেখা পাওয়া যায় না। এখন গাঙের পানি বাঁধের কানায় আইসে ঠেকছে, আর অমনি পাউবোর ঠিকাদারেরা বাঁধে মাটি দিতে আইছে। শুনতিছি এ মাসের শেশে নাকি পানি আরও বাড়বি।
পাউবো খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল আলম বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। কাজের শুরুতেই যদি টার্গেট অনুযায়ী টাকাটা আসে, তাহলে কাজটা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব।তবে আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি।










































