Home কলাম খুব খেয়াল! পিছে পুলিশ, সামনে দেয়াল

খুব খেয়াল! পিছে পুলিশ, সামনে দেয়াল

11


আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু
আমাদের যৌবনে আমরা অনেক গুলি ইঙ্গিত পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করতাম। তার একটি হচ্ছে “ খুব খেয়াল। পিছে পুলিশ; সামনে দেয়াল”। যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে পুলিশের ইমেজ ও ক্ষমতা আজকের তুলনায় অনেক অনেক গুন বেশী ছিল । পুলিশে ধরলে তখন মহা বিপদ, এখনও যদিও বিপদ রয়েছে। কারণ তাদের আইনের পার প্যাচ গলিয়ে বের হওয়া খুব কঠিন ছিল। সে যাই হোক প্রশ্ন উঠতে পারে প্রায় ৩০ বছর পরে কেন আবার সেই পুরানো প্রচলিত বাক্য আবার মনে পড়ছে ?
হ্যাঁ, সম্প্রতি ভূ-রাজনীতির যাতাকলে বাংলাদেশের অবস্থান দেখতে গিয়ে এই কথাটি মনে পড়েছে। অর্থাৎ সামনেও পেছনে দুই দিকেই বিপদ, সাবধান কান্ডারী। একটু খোলসা করার চেষ্টা করি।
ভূরাজনীতি বা জিওপলিটিক্স একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সম্পর্কের সমন্বয়ে তৈরি । এটি একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থিতি এবং অগ্রগতি নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ নানা কারনে ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে ভূ-রাজণীতির এই বিষটি আরও গুরুত্বপুর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে যেহেতু অর্ন্তবর্তী কালীন সরকার প্রধান চীনে সফরে গেছেন তাই তৃতীয় দৃষ্টিকোনে বিষয়টি বুঝবার চেষ্টা করছি। চীনে যাওয়া আমাদের জন্য নতুন কিচু নয়। কিন্তু প্রতিবার চীন সফরের পরে বাংলাদেশের আভ্যন্তিরন অনেক বিষয়ে পরিবর্তন বা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকারের চীন সফরের পর থেকে তার সরকার চাপে পড়তে থাকে। চীন থেকে সাবমেরিন কেনার পর চাপের মাত্রা কোন পর্যায়ে ছিল তা অনুধাবন করা কঠিন।
বালাদেশের ভৌগলিক অবস্থান একটি জানা প্রয়োজন তানা হলে রাজনীতির পাঠ নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে ভারত, পশ্চিমে ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার অবস্থিত, এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অবস্থানও দেশের সামুদ্রিক নীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা এবং পরিবহন রুটসমূহের ওপর বাংলাদেশীয় নিয়ন্ত্রণ, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও শক্তি সংক্রান্ত ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ভূরাজনীতি ভারত প্রভাব অনস্বীকার্য। ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা এবং অর্থনীতি সবকিছুতেই গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ভারত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় একধরনের প্রভাব বিস্তার করেছে। সুতরাং, ভারত বাংলাদেশের ভূরাজনীতির এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে মিয়ানমার বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, যার সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস একটু জটিল। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় এবং জাতিগত সমস্যা আছে, বিশেষত রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের ভূরাজনীতি চীন এবং ভারত এর সাথে সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারত ও চীনের রাজীনতক কৌশলে এই অঞ্চলের ভৌগলিক সীমারাখা পরিবর্তন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অর্থাৎ এই দুই শক্তির প্রভাব বিস্তারে বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন একটি মানচিত্র তৈরী হতে যাচ্ছে বলছেন বিশ্লেষকরা। এই মানচিত্র তৈরী হলে বাংলাদেশের জন্য তা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের হবে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতিতে অনেকটা পরিবর্তন আনতে হবে। ভূখন্ডের নতুন মানচিত্র পরিবর্তনের ঢেউ বাংলাদেশের লাগবার শঙ্কাকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
এবার একটু চোখ বুলানো যাক এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি চীনের দিকে। বিশ্বব্যাপী চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং এর প্রভাব বাংলাদেশের উপরও পড়ছে। চীনের “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ এই উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করছে, বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নে। কিন্তু, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও কিছু উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে ভারতীয় ভূরাজনীতিতে।
চীনের উপস্থিতি বাংলাদেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, চীনের ভূমিকা দক্ষিণ চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগরে শিপিং রুটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের ভূরাজনীতির জন্য প্রভাব ফেলছে।
আলোচনাটা আরো একটু সরু ট্যানেলের মধ্যে দিয় দখতে চেষ্টা করা যাক । যদি প্রশ্নটি তুলি বাংলাদেশ কোন দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করবে: চীন না ভারত?
এই প্রশ্নের সোজা উত্তর পাওয়া বোধ করি প্রায় অবসম্ভভ । কারণ বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে চীন এবং ভারত উভয়েই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম বৃহত্তম প্রতিবেশী এবং সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের এক বড় অংশীদার। অন্যদিকে চীন, যদিও প্রতিবেশী নয়, তবে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাংলাদেশে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীন বিশেষ করে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সুতরং একদিকে বিনিয়োগ অন্যদিকে নিকটতম বৃহত্তম প্রতিবেশী।
যেকোনো দেশের জন্য তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই সম্পর্কের প্রকৃতি এবং তার ভবিষ্যত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং চীনের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন প্রতিটিরই সুবিধা এবং বিপরীত তাৎপর্য রয়েছে।
ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন বাংলাদেশকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রদান করতে পারে। ভারত বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। ভারত বাংলাদেশকে বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি এবং বাণিজ্যিক সুযোগ প্রদান করে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও বন্দর নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ আনতে পারে। এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিকাশে সহায়তা করবে। চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে, বিশেষ করে “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ লাভবান হবে। চীন বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ করছে, যা বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।
কিন্তু ভারত-চীন সম্পর্কের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যায় ফেলতে পারে। ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতির কারণে বাংলাদেশ ভারতের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার হতে পারে। অপরদিকে চীন তার অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, কারণ পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যে চীনের প্রতি সন্দেহ এবং বিরোধিতা রয়েছে।
এজাতীয় জটিল সমীকরণের উদাহরন আছে । যেমন পাকিস্তান ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন নিয়ে একাধিকবার বিপরীত ফলাফল পেয়েছে, আবার শ্রীলঙ্কার সাথে চীনের সম্পর্ক বৃদ্ধি শ্রীলঙ্কার ভূরাজনীতিতে এক ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। ভারত, যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং একটি অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, চীনের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে একটি বিরোধের কারণ হিসেবে দেখতে পারে। এর ফলে, বাংলাদেশ ভারতীয় নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অবস্থানে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে।
সুতরং চীন এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং তাদের বিপরীত তাৎপর্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। দু’টি শক্তিশালী দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমীকরণ বুঝতে ব্যর্থ হলেই মাশুল দিতে হবে আমাদের।
লেখক: সংবাদকর্মী