Home কলাম বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশ

বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশ

19


-মনিরা নাজমী জাহান


জঙ্গিবাদ একটি বিশ্বজনীন সমস্যা। দুনিয়ার কোনো জাতিই এ সমস্যা থেকে মুক্ত নয়, এমনকি নিরাপদও নয়। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্ত যখন জঙ্গিবাদে আক্রান্ত হয় তা পৃথিবীর আরেক প্রান্তকেও নিরাপত্তাহীন করে তোলে। জঙ্গিবাদের এই ভয়াবহ বিস্তার পুরো পৃথিবীর মানুষকে ভয়াবহ উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলেছে। যে কোনো প্রাণনাশক সংক্রামক ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত বিস্তার ঘটাতে সক্ষম এই জঙ্গিবাদ নামক ভাইরাস। জঙ্গিবাদের ভাইরাস এতই ভয়াবহ যে মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসিমুখে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু নিজের প্রাণ না নিজের অতি প্রিয় এবং আপনজনের প্রাণ বিসর্জন করতেও কুণ্ঠিত হয় না। তবে এই জঙ্গিবাদকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সব সময় উচ্চারিত হয় তাহলো এই জঙ্গিবাদে কারা উদ্বুদ্ধ হয় এবং কেন উদ্বুদ্ধ হয়?
অপরাধ বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েও বেশ হিমশিম খেয়েছেন। কারণ সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন যে ঠিক কোন গোত্র, ধর্ম, বর্ণের বা মতবাদে বিশ্বাসী লোক জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হবে। নিবরাসের মতো উদারমনা পাশ্চাত্য শিক্ষায় বিশ্বাসী ছেলের যেমন জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ত হওয়ার ইতিহাস আছে ঠিক তেমনি আছে রিচার্ড রেইড নামক অল্প শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ব্রিটিশ যুবকের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার ইতিহাস যে কিনা ২০০১ সালে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্যারিস থেকে মিয়ামিগামী একটি বিমানে আগুন লাগাবার চেষ্টা করেছিল। নিদাল মালিক হাসান নামক যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর মেজরের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততারও ইতিহাস রয়েছে। যিনি ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর একাই খুন করেছেন ১৩ জন মানুষকে এবং মারাত্মকভাবে আহত করেন ৩০ জন মানুষকে। আবার যদি আমরা চিন্তা করি যে কোনো বিশেষ ধর্মের লোকরাই কি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়? তাহলে চিন্তাটা ভুল হবে কারণ বেলিজিয়ামের ১৯ বছরের তরুণ অ্যাথলেট ব্রায়ান ডি মুলার, যিনি ছিলেন একজন কট্টর খ্রিস্টান ক্যাথলিক পরিবারের সন্তান। সেই মুলার সিরিয়ায় আইএস জঙ্গিদের দলে যোগ দেন। রাক্কায় আইএস জঙ্গিদের খিলাফত ঘোষণার দিন ট্যাংকের মাথায় আইএস যোদ্ধাদের সঙ্গে এই মুলারকেও দেখা গেছে। যদি চিন্তা করি যে রক্ষণশীল চিন্তা-ভাবনার মানুষরাই হয়তো জঙ্গিবাদে বেশি উদ্বুদ্ধ হয় তাও হিসাব মেলানো কঠিন কারণ দুই মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফলি ও স্টিভেন সটলফ এবং ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিড হাইনেস এবং এলান হেনিংয়ের হত্যাকারী জঙ্গির নাম ছিল জন। বিশ্বব্যাপী যিনি পরিচিত ছিলেন জিহাদি জন নামে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এই জন ছিলেন একজন ব্যান্ড দলের র‌্যাপার। এখনো অনলাইন খুঁজলে এই জনের র‌্যাপার হিসেবে অনেক ছবি খুঁজে পাওয়া যাবে। ২০১৩ সালে এই জন সিরিয়াতে গিয়ে আইএস যোগ দেয়। কিংবা আমরা আমরা যদি সিডনির বাসিন্দা ৩৩ বয়স্ক মহাম্মদ আলী বারায়লির কথাই ধরি, যার হাত ধরে সিডনি থেকে বহু মানুষ সিরিয়াতে পাড়ি জমিয়েছে। তাহলেও দেখব আইএসে যোগ দেয়ার আগে বারায়লি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান টিভি শো আন্ডারবেলির একজন জনপ্রিয় অভিনেতা। যিনি ছিলেন একজন ভোগবাদী মানুষ। মেতে থাকেন ভোগবাদী জীবনের রঙিন দুনিয়াতে। সেই বারায়লি আইএসে যোগ দিয়ে হয়েছেন শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি।
জঙ্গিবাদে কারা উদ্বুদ্ধ হয় এই কথার উত্তরে নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে কোনো গোত্র-ধর্ম-বর্ণ বা মতবাদের লোক জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। দ্বিতীয় যে বিষয়টিতে আলোকপাত করা প্রয়োজন তাহল জঙ্গিবাদে কেন বা কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে অপরাধ বিজ্ঞানীরা কোনো সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা বা ব্লু প্রিন্ট দিতে পারেননি। তবে মোটাদাগে পুরো প্রক্রিয়াতে ৩টি ধাপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রথম ধাপে একজন মানুষের প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থায় প্রতি এক ধরনের হতাশা, ক্ষোভের জন্ম নেয়। তিনি নিজেকে বঞ্চনার স্বীকার বলে মনে করতে থাকেন এবং সেই পরিস্থিতি থেকে তিনি স্বপ্ন দেখতে থাকেন এক পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার। দ্বিতীয় ধাপে তিনি সুনির্দিষ্ট মতবাদ বা মতাদর্শ গ্রহণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতে থাকেন এই মতবাদ বা মতাদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারলে তিনি যে বঞ্চনার শিকার তা দূর হয়ে যাবে। তিনি যে সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন তা এই মতবাদ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। তখন তিনি এই মতাদর্শ দ্বারা গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হতে থাকেন। সর্বশেষ স্তরে যে বিষয়টি ঘটে তা হচ্ছে তিনি খুঁজে বের করেন তার সেই উদ্বুদ্ধ হওয়া মতবাদের অনুসারীর অন্য মানুষদের। তিনি সেই মতবাদের অন্য মানুষদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার মাধ্যমে তাদের দলে যোগদান করেন। তবে এই কথাও সমভাবে সত্যি যে আই ৩ ধাপের বাইরেও অসংখ্য কারণ রয়েছে, যার জন্য মানুষ জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
১৫ বছরের স্কুল ছাত্রী ব্রিটিশ নাগরিক ইয়ুশরা। যার স্বপ্ন ছিল ডেন্টিস্ট হওয়ার। সেই ১৫ বছরের স্কুল ছাত্রীটি ১৭ বছরের আরেক তরুণের হাত ধরে পাড়ি জমায় সিরিয়াতে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীতে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারে বসবাসরত ১৭ বছরের এক কিশোরীর অনলাইনে প্রেম হয় সিয়িরাতে থাকা এক জঙ্গির সঙ্গে, সেই প্রেমের টানে সিরিয়ার পথে পা বাড়ান সেই ১৭ বছর বয়স্ক কিশোরী। সঙ্গে নেন ১৫ বছর বয়সী তার এক বোন এবং ১৬ বছরের এক বান্ধবীকে।
কসোভোর ৮ বছরের শিশু ইরিয়ন বিশ্ব গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে উঠেছিল স্বেচ্ছায় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যাওয়ার জন্য নয় বরং তার বাবা তার মার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কারণে এক রকম জোর করে ইরিয়নকে কেড়ে নিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান। এই রকম আরেকটি ঘটনা ঘটে। খালিদ শারৌফের ক্ষেত্রে। যিনি ছিলেন একজন অস্ট্রেলিয়ান নির্মাণ শ্রমিক। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন ভয়াবহ রকম দাঙ্গাবাজ এবং মাদকাসক্ত। এই লোকও তার স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ৭ বছরের ছেলেকে নিয়ে সিরিয়ার আইএসে যোগদান করেন। আবার ২৪ বছরের কসোভোর যুবক ব্লেরিম হেটা। ইউটিউবে জঙ্গিবাদের বয়ান শুনে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হন। ২০১৩ সালে কাউকে কিছু না বলে সিরিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান।
উপরের উদাহরণ এবং কারণ ছাড়াও রয়েছে পৃথিবীজোড়া অসংখ্য উদাহরণ এবং কারণ যার জন্য মানুষ জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।
এই কথা অনস্বীকার্য যে এখন পর্যন্ত জঙ্গিবাদে কারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং কেন উদ্বুদ্ধ হচ্ছে তার প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। বরং এই কথাই সত্য যে, এখন পর্যন্ত যে কারণ আমাদের সামনে চিহ্নিত হয়েছে তার বাইরেও রয়েছে আরো অসংখ্য কারণ। তাই জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করতে হবে আরেকদিকে সমাজে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

মনিরা নাজমী জাহান : শিক্ষক, ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়।