Home Uncategorized নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন মেরুতে রাজনৈতিক দলগুলো

নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন মেরুতে রাজনৈতিক দলগুলো

36

 

ঢাকা অফিস।।

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে হুইসেল বাজিয়ে নির্বাচনী ট্রেন যাত্রা শুরু করলেও দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই মেরুতেই অবস্থান করছে।

কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ যতই থাকুক না কেন, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং সংবিধানের বিধান অনুসরণ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল গত বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে এ আহ্বানে দেশের রাজনৈতিক হাওয়ায় এখনো বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায়নি।

টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ট্রেন ধরার প্রতিযোগিতায় বরাবরের মতো আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি আগের মতোই নির্বাচন বয়কট করার অনড় অবস্থানে থেকে ঘোষিত তফসিল প্রত্যাখ্যান করে পাঁচ দফা অবরোধের পর আগামী রোববার থেকে ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক হরতাল ডেকেছে। এর মধ্যে বিএনপির সমমনা দলগুলো আছে হরতাল-অবরোধ-আন্দোলনে আর ১৪ দলীয় জোটের মিত্ররাসহ নিবন্ধনভুক্ত কিছু ‘ছোট’ দল নির্বাচনে যাওয়ার বড় আওয়াজ দিয়েছে।

এদিকে, ভোটের রাজনীতিতে প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ‘ভঙ্গুর’ লাঙ্গল দিয়ে চাষ করে ‘ভালো’ ফসল ঘরে তোলার হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। দলটি প্রকাশ্য ঘোষণায় দুই ভাগে বিভক্ত না হলেও রাজনীতির মাঠে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের এই দুই ঘরানায় এরই মধ্যে বিভক্ত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থাকায় দলটি শাসক দলের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করে। পরে বিএনপির চেয়ে বেশি আসন পাওয়ায় সরকারের আগ্রহে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে। দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের অনুসারী সূত্র বলছে, এবারও এমন হিসাব-নিকাশের অপেক্ষায় আছে জাতীয় পার্টি। তবে অত সময়ক্ষেপণে রাজি নন সংসদ উপনেতা রওশন এরশাদ ও তার অনুসারীরা। গতকাল রওশন এরশাদ তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং তার অনুসারী জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ‘রওশন এরশাদের নেতৃত্বে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব। এ জন্য সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি আমরা।’ নির্বাচনে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ২১ জন সংসদ সদস্য অংশ নিচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে, কঠোর-কঠিন অবস্থানগুলো থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সরে এসে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করবে কি না সেদিকে নজর এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে এ সপ্তাহেই প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর চিঠি দেয়া এবং সিইসি তফসিল ঘোষণার সময় আবারও সংলাপে বসার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানানোয় সংলাপের ক্ষীণ সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে ডোনাল্ড লুর চিঠির জবাব দিতে গিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গত বুধবার জানান, সংলাপের জন্য সরকারি দলকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এর জবাবে না হলেও গতকাল আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের জানান, নির্বাচন ঘিরে অনেক ফুল ফুটবে। অনেক ফুল বিকশিত হবে। এ সময় তিনি সংলাপের আর সময় নেই বললেও জানিয়েছেন, আপনাদের জন্য নির্বাচনের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। বিএনপিও যদি মত পরিবর্তন করে নির্বাচনে আসে ওয়েলকাম।

গতকাল নির্বাচনের বিষয়ে রাজধানীর তেজগাঁও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারি দলের অবস্থান স্পষ্ট করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধানের রীতিনীতি-বিধিবিধান পালনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় সহযোগিতা করার জন্য আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

সেতুমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্রের পথে রাষ্ট্রক্ষমতা বদলের চিন্তা করে না। নির্বাচনে আমরা সবসময় গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যতীত ও জনগণের রায় ছাড়া কখনো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়নি। জনগণের ভোট ও অধিকারের জন্য আমরাই সংগ্রাম করেছি।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন তার অর্পিত দায়িত্ব ক্ষমতাবলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিলকে স্বাগত ও ধন্যবাদ জানিয়েছি। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে একটা অর্থবহ নির্বাচন করতে সক্ষম হবে।

বিএনপির আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের এই আন্দোলন করে কিছু হবে না। নির্বাচন থামবে না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। আমরা সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করতে চাই। সবাই আসুন। আমরা একা ক্ষমতায় যেতে চাই না।

ওবায়দুল কাদের বলেন, সবাইকে আহবান জানাব নির্বাচনে অংশ নিন। সরকারি দল হিসেবে অনুরোধ করছি, কারও জন্য কোনো বাধা নেই। আপনাদের জন্য নির্বাচনের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। বিএনপিও যদি মত পরিবর্তন করে নির্বাচনে আসে ওয়েলকাম।

তবে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ গতকাল দাবি করেছেন, বিএনপি দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ না নিলেও তাদের অনেক নেতা অংশ নেবেন। গতকাল একটি চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন গতকাল বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির দুই নেতা ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, তাদের সঙ্গে আরও শতাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। সুতরাং এগুলো করে বিএনপির কোনো লাভ হবে না।

এদিকে, যেন তথ্যমন্ত্রীর কথার সমর্থনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসা সংগঠন তৃণমূল বিএনপি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন এর নেতারা। সদ্য নিবন্ধনপ্রাপ্ত দলটির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ঘোষিত তফসিলকে তৃণমূল বিএনপির পক্ষ থেকে স্বাগত জানাই। তৃণমূল বিএনপি আশা ও প্রত্যাশা করে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে।

তৃণমূল বিএনপি নির্বাচনমুখী দল মন্তব্য করে তিনি বলেন, আগামী ১৮ নভেম্বর থেকে তৃণমূল বিএনপির মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু হবে। আগামী ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর প্রত্যাশী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে। আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করব।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলটির নির্বাহী চেয়ারপারসন অন্তরা সেলিমা হুদা, মহাসচিব তৈমুর আলম খন্দকার, যুগ্ম মহাসচিব মো. আক্কাস আলী প্রমুখ।

অন্যদিকে, নিজেদের দাবিতে অনড় থেকে একতরফা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে আগামী রোব ও সোমবার (১৯ ও ২০ নভেম্বর) সারা দেশে ৪৮ ঘণ্টা সর্বাত্মক হরতাল ডেকেছে বিএনপি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ও তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ গ্রেপ্তার সব নেতা-কর্মীকে মুক্তি দিতে বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকাসহ দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ঘোষণা করছি। রোববার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সারা দেশে সর্বাত্মক এই হরতাল কর্মসূচি পালিত হবে। পৃথক সংবাদ সম্মেলনে ও বিবৃতিতে একই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এলডিপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, লেবার পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, ১২ দলীয় জোটসহ সমমনা দল ও জোট।

তবে নির্বাচনের ব্যাপারে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না পাওয়া গেলেও সংসদের উপনেতা রওশন এরশাদের অনুসারীরা নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রওশন অনুসারী জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা দাবি করেছেন, ‘জাতীয় পার্টি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং একটি নির্বাচনমুখী দল। এ জন্য সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির ২৬ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২১ জন আমাদের সঙ্গে আছেন। তারা সবাই নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছেন।’

জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মসিউর রহমান বলেন, ‘জি এম কাদের এবং উনার সঙ্গীরা নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না বলতে পারছি না। তারা ভালো বলতে পারবেন। এখনো এ বিষয়ে আমাদের কিছুই জানাননি তারা। তারা যদি নির্বাচনে অংশ নাও নেন, তাহলেও আমরা অংশ নেব। দুই-তিন দিনের মধ্যে দলীয়ভাবে বিষয়টি জানানো হবে।’

তবে মসিউর রহমানের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রংপুর মহানগরের সভাপতি সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেছেন, ‘রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কোনো নেতা নন। আর মসিউর রহমান দল থেকে বহিষ্কৃত। তার বক্তব্য দলের নয়।’

এদিকে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে বিভক্তি চলছে অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোতেও। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণ করে ২৯৮ আসনে প্রার্থী দেয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা একদলীয় শাসনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না। একই দাবি জানিয়ে নির্বাচনে অংশ না করার কথা বলেছে আরেক ইসলামী দল খেলাফত মজলিস। গতকাল আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে নির্বাচন কমিশনকে লালকার্ড প্রদর্শন করে মিছিল করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টি। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে অংশ নেয়ার কথা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে সুপ্রিম পার্টি।

দলটিসহ লিবারেল ইসলামিক জোট চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী বলেছেন, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে নির্বাচনের বিকল্প নেই। যথাসময়ে নির্বাচন না হলে অশুভ শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। তা কোনোভাবেই দেশ-জাতির জন্য কল্যাণকর নয়।

এদিকে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভা আজ শুক্রবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর তেজগাঁওতে ঢাকা জেলা ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। ওই সভায় শাসক দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো দিকনির্দেশনা দেন কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।