Home Lead এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের সাত কারণ

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের সাত কারণ

6


>>খাতা মূল্যায়নে উদারতা থেকে কঠোরতা
>> শ্রেণিকক্ষবিমুখ, কোচিং-গাইডনির্ভরতা


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে রীতিমতো ধস নেমেছে। এই অবনতির পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বল প্রস্তুতি নয়, উঠে এসেছে শিক্ষাব্যবস্থার নানা কাঠামোগত সংকটের প্রসঙ্গও। এই অবনমনের কারণ হিসেবে উঠে এলো ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (আইসিটি) ৬৪ শতাংশের ফেল করা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শ্রেণিকক্ষবিমুখ ও কোচিং-গাইডনির্ভরতার কথা। শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে পাঁচ বছর পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, উত্তরপত্র মূল্যায়নে উদারনীতির বদলে কঠোরতা এবং জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের একাংশের পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতির বিষয়গুলো।

ইংরেজি ও আইসিটিতে অর্ধেক শিক্ষার্থী ফেল

বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজি ও আইসিটিতে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। এবার ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। আর ফেল করেছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। এর মধ্যে ইংরেজি ও আইসিটিতে ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন; ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। অর্থাৎ, ফেল করা শিক্ষার্থীর ৬৪ দশমিক ৩০ শতাংশ এ দুই বিষয়ে।

এ দুটি বিষয়ে বেশি ফেল করার কারণ হিসেবে দুটি বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক না থাকা, অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পড়ানোর কারণ উল্লেখ করলেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান। তিনি বললেন, ‘যুগ যুগ ধরে আমরা এ চিত্র দেখেই আসছি। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের হিসাবে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আইসিটিতে পাসের হার ৭২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ ইংরেজিতে প্রায় ৩৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং আইসিটিতে ২৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, ইংরেজিতে এমনিতেই শিক্ষক সংকট। এর মধ্যে যারা আছেন তারাও ঠিকঠাকমতো ক্লাসরুমে পড়ান না। তার সঙ্গে এসব শিক্ষকদের বড় অংশই ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডারের দুর্বলতা; নিয়মিত পড়া, লেখা ও কথা বলার চর্চার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে আইসিটিতে ব্যবহারিক শিক্ষার ঘাটতি, পর্যাপ্ত কম্পিউটার ও ল্যাব সুবিধা না থাকা এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব বড় সমস্যা।

আইসিটি শুধু বই পড়ে শেখার বিষয় নয়, এর জন্য ব্যবহারিক দক্ষতা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান। অথচ এই বিষয়ে পড়ান অন্য বিষয়ের শিক্ষক। যিনি নিজেই কম্পিউটার চালাতে পারেন না, তিনিই পড়ান কম্পিউটার ব্যবহার, বিভিন্ন সফটওয়্যারের বিষয়। এই দৈন্যদশা থেকে বের হতে হলে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব ও শিক্ষক বাড়াতে হবে।

খাতা মূল্যায়নে উদারতা থেকে কঠোরতা

এবারের ফল বিপর্যয়ের আলোচনায় উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন। দীর্ঘ বছর ধরে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে উদারভাবে নম্বর দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর উত্তরের মানের তুলনায় বেশি নম্বর পাওয়ার অভিযোগও ছিল। এবার সেই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে খাতায় শিক্ষার্থীরা যা লিখেছে, তার ভিত্তিতে নম্বর দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, বিএনপি সরকারের সময়ে প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীরা খাতায় যে উত্তর দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই ফল দেওয়া হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

জুলাই আন্দোলন ও পরীক্ষার্থীদের ‘হিরোইজম’ মনস্তত্ত্ব

চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় বসা ব্যাচটি মূলত ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণআন্দোলনে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সরাসরি রাজপথে এবং অগ্রভাগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই আন্দোলনের পর পরবর্তী দুই বছর ধরে এই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ বা বীরত্বগাথার অনুভূতি কাজ করেছে।

ফলে নিজেদের জাতীয় ও রাজনৈতিক চেতনায় অতিমাত্রায় যুক্ত মনে করায় অনেকেই সাধারণ পড়াশোনা, বইনির্ভর প্রস্তুতি এবং নিয়মিত পরীক্ষার শৃঙ্খলা থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়। শিক্ষার্থীদের মানসিকতার এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতিকে এবারের রেকর্ড ফল বিপর্যয়ের অন্যতম বড় ও পরোক্ষ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু যেমনটি বলছিলেন, ‘আমরা পরীক্ষা নিতে গিয়ে দেখি ছেলেমেয়েদের মধ্যে জুলাই মাসের সেই হিরোইজম এখনো কাজ করছে।’

মফস্বল কলেজগুলোর ধারাবাহিক খারাপ ফল

শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজগুলোতে গুণগত শিক্ষার পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি প্রকট। এসব প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও আইসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষিত ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের অভাবে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে গাইডবই ও নোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, তদারকির অভাব এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষবিমুখের কারণে মফস্বল কলেজগুলো প্রতি বছরই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, মফস্বলে শিক্ষার মান বাড়ানো ও দক্ষ শিক্ষক পদায়নের জন্য আলাদাভাবে কাজ হচ্ছে।

পাঁচ বছর পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস

ফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা। ২০২০ সালে কভিড মহামারীর কারণে অটোপাস দেওয়া হয়। পরের বছরগুলোয় সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। ফলে অনেকের পক্ষে পুরো পাঠ্যসূচি শেষ করে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়েছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেছেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ বছর পর শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা দিয়েছে। আগের বছরগুলোতে অটোপাস ও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের কারণে পুরো পাঠ্যসূচি শেষ করার অভ্যাস তৈরি হয়নি। শিক্ষকরাও শ্রেণিকক্ষে পুরো সিলেবাস শেষ করতে পারেননি। ফলে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকার প্রবণতা ফল বিপর্যয়ের আরেকটি বড় কারণ। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ জেড এম রেজাউল করিম খান বলেছেন, অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকে। বাকিরা অনুপস্থিত। প্রতিষ্ঠাননির্ভর পড়াশোনা ছেড়ে কোচিং ও গাইডবইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিক্ষার প্রকৃত মান ক্ষুণ্ণ করছে।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীর মতে, করোনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গিয়ে কোচিং সেন্টারের শিট ও মুখস্থনির্ভর পড়াশোনায় ঝুঁকেছে তারা। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাবও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। অনেক প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও আইসিটি পড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। আবার যারা পড়াচ্ছেন, তাদের অনেকেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি বা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২ হাজার ৬২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই।

বর্তমানে ইংরেজি পড়াচ্ছেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাদের মধ্যে ৫১ হাজার ৩৬০ জনের ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই। অন্যদিকে, ৩ হাজার ৮৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পেশাগত প্রশিক্ষণও নেই।

শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনও শিক্ষক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, বিগত দিনের শিক্ষক সংকট রয়েছে। নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা আছে। একসঙ্গে এত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। পিএসসিও সব নিয়োগ দিতে পারছে না। গত ১৭ বছরের একটি ব্যাকলগ রয়েছে।

শিক্ষকদের অবহেলা আর শিক্ষার্থীদের গাফিলতি দুটিকেই ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু। তার মতে, পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আগের ধ্বংসাত্মক অবস্থা থেকে বের করে নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পড়ালেখার মান ফেরাতে শিক্ষকদের ক্লাসে আরও মনোযোগী হতে হবে এবং পরীক্ষার্থীদেরও অলসতা কাটিয়ে টেবিলে ফিরতে হবে।