ঢাকা অফিস।।
একদফার যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির লক্ষ সরকারবিরোধী সব দলকে নিয়ে একযোগে একটি কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা। দলটির নেতারা মনে করছেন, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, সরকারের মনোভাব তত কঠোর হবে। এমন পরিস্থিতিতে রাজপথের আন্দোলন জোরদারে সরকারবিরোধী দলগুলোকে দ্রুত সময়ের মধ্যে একত্রিত করতে চাইছে বিএনপির হাইকমান্ড। সেই ভাবনা থেকেই জামায়াতে ইসলামীসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতাদের বক্তৃতায়ও এর ইঙ্গিত মিলেছে।
সব দলকে এক করার এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে কয়েকটি প্রধান ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের বৈঠকসহ ফোনালাপ হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও দূরত্ব ঘোচানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। গত ২৯ জুলাই ঢাকায় বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশি আক্রমণ ও হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। ২ আগস্ট তারেক রহমান দম্পতির সাজার বিরুদ্ধেও বিবৃতি দেন দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মা’ছুম। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন এবং হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও ভেতরে ভেতরে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। অন্য ছোট রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে এগোতে চায় দলটি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।
তবে প্রধান ইসলামী দলগুলো যাতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে না যায়, সে বিষয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে সরকারও। প্রায় সব দলের সঙ্গেই সরকারের পক্ষ থেকে নানাভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচানোর উদ্যোগ : বিএনপির নেতৃত্বের প্রতি ‘ক্ষোভ’ এবং ‘অভিমান’ থেকেই দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বিএনপি অন্য সব দলের সঙ্গে আলোচনা করলেও জামায়াতের সঙ্গে করেনি। এর পরও অনেকটা আগ বাড়িয়ে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। এসব কর্মসূচিতে দলটির নেতাকর্মীদের আহত কিংবা গ্রেপ্তারের বিষয়েও চুপ ছিল বিএনপি। এতে যুগপতের কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে জামায়াত। তবে নিজস্ব কর্মসূচি ঘোষণা করে মাঠে তৎপর রয়েছে দলটি।
এদিকে জামায়াতে সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে বিএনপির তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। গত ২৮ জুলাই ঢাকায় মহাসমাবেশের আগে এবং পরে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের ফোনালাপ হয়েছে। ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থান কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে কৌশলগতভাবে উভয় দলের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হয়। সম্প্রতি ঢাকায় দুই দলের নেতাদের মধ্যে একটি বৈঠকও হয়েছে। তাই আশা করা যায়, হয়তো সামনের আন্দোলনে জামায়াতকেও পাশে পাবে বিএনপি।
ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত : এদিকে চলমান একদফার আন্দোলনে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনকেও পাশে চায় বিএনপি। এ নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বরিশালে চরমোনাই দরবার শরিফের বার্ষিক মাহফিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখান থেকেই ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগের শুরু। সেখানে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বৈঠকও করেন।
বিএনপির দাবি, তারা চরমোনাইয়ের বার্ষিক মাহফিলে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে যাননি। বরং আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে গিয়ে চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। অবশ্য আরও কয়েকটি দলের নেতৃবৃন্দ সেখানে গিয়েছিলেন। বিএনপির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হলেও যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দুই দলকে কীভাবে আরও কাছাকাছি আনা যায়, সেই কাজ চলছে।
ইসলামী আন্দোলনের কয়েকজন নেতা জানান, বিএনপির কিছু দাবির সঙ্গে তাদের মিল রয়েছে। তবে উভয় দলের রাজনৈতিক আদর্শ ও লক্ষ্য ভিন্ন। তাই চরমোনাই পীর ভেবে-চিন্তে কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির প্রত্যাশা, একদফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে অন্য সমমনা দলগুলোর মতো ইসলামী আন্দোলনও যুক্ত হোক। কেননা, যত বেশি রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা যাবে, সরকারের ওপর চাপ তত বাড়বে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, দেশের গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার ফেরাতে আমরা সবাইকেই রাজপথে দেখতে চাই। এ নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। ডান-বামসহ সব রাজনৈতিক দল নিয়ে আমরা চলমান আন্দোলনে যেতে চাই।
ইসলামী আন্দোলনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আশরাফ আলী আকন বলেন, বিএনপির নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে নানাভাবে কথাবার্তা হচ্ছে। বিএনপি যেসব দাবিতে কর্মসূচি করছে তার কাছাকাছি দাবি আমাদেরও। তবে ইসলামী আন্দোলন এ নিয়ে পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করছে।
অবস্থান পরিষ্কার নয় হেফাজতের: এবারের আন্দোলনে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামকেও পাশে চাইছে বিএনপি। তারা নানাভাবে হেফাজতের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। যদিও কোনো পক্ষই বিষয়টি স্বীকার করছে না। আনুষ্ঠানিকভাবে হেফাজতের পক্ষ থেকে বিএনপিকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া না হলেও দলটি তাদের পূর্বঘোষিত ১৩ দফা দাবি পূরণ করতে অনড়।








































