Home আঞ্চলিক বনে ফিরছে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী

বনে ফিরছে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী

5

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট||
কয়েক দশক আগেও সুন্দরবন ও আশপাশের নদনদীতে প্রচুর নোনাপানির কুমির দেখা যেত। ধীরে ধীরে এই কুমিরের সংখ্যা কমতে শুরু করে। একই অবস্থা বাটাগুর বাসকা নামে কচ্ছপের। ২০০০ সাল থেকেই কচ্ছপের এই প্রজাতিটির দেখা মেলে না।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিপন্ন প্রাণীর একটি তালিকা করে, যা সংগঠনটির রেড লিস্ট নামে পরিচিত। ওই তালিকায় নোনাপানির কুমিরকে বাংলাদেশে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আর বাটাগুর বাসকাকে তালিকাভুক্ত করা হয় মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে।
আশার কথা হচ্ছে, প্রাণীগুলো কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। গত ৯ বছরে কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে ২০৬টি বিপন্ন প্রজাতির নোনাপানির কুমির সুন্দরবনের নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বাটাগুর বাসকা অবমুক্ত করা হয়েছে ১২টি।
বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনার এই কার্যক্রম চলছে পূর্ব সুন্দরবনের করমজলে। বন বিভাগের উদ্যোগে প্রায় দুই দশক ধরে চলছে এই কাজ। বর্তমানে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে ১২৯টি কুমির এবং ৪৩২টি কচ্ছপ রয়েছে।
বন বিভাগ থেকে জানা গেছে, ২০০২ সালে পূর্ব সুন্দরবনের করমজল পর্যটনকেন্দ্রে ৮ একর জমিতে গড়ে তোলা হয় বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র। শুরুতে রোমিও ও জুলিয়েট নামে দুটি কুমির দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রজনন কেন্দ্রের কার্যক্রম। ২০০৫ সালে কুমির দুটি ডিম পাড়লে সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে কুমির প্রজনন শুরু হয়।
একইভাবে বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপের কৃত্রিম প্রজননের কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে। অবশ্য বন বিভাগের সঙ্গে বাটাগুর বাসকার গবেষণায় সঙ্গী হয় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, অস্ট্রিয়ার জু ভিয়েনার গবেষণা দল ও যুক্তরাষ্ট্রের টার্টল সারভাইবাল অ্যালায়েন্স। ২০১৭ সাল থেকে কেন্দ্রটিতে ডিম দিতে শুরু করে মহাবিপন্ন প্রজাতির বাটাগুর বাসকা কচ্ছপগুলো।
গত এক যুগ ধরে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন হাওলাদার আজাদ কবীর। তাঁর হাত ধরেই প্রকৃতিতে ফিরতে শুরু করেছে নোনাপানির কুমির। তিনি বলেন, রোমিও-জুলিয়েটের পর প্রজননের জন্য পিলপিল ও আলেকজান্ডার নামে আরও দুটি কুমির আনা হয়। মধ্যে জুলিয়েট ও পিলপিল ডিম দেয়। ডিমগুলো ইনকিউবেটরে রেখে বাচ্চা ফোটানো হয়।
তিনি বলেন, সাধারণত কুমিরের বয়স ৭-৮ বছর হলে এবং দৈর্ঘ্য দুই মিটারের বেশি হলে এগুলো প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়। ২০১৩ সাল থেকে বনের নদীতে কুমির অবমুক্ত শুরু করে বন বিভাগ। গত ৯ বছরে ২০৬টি কুমির অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গত বছরই অবমুক্ত করা হয়েছে ৯০টি কুমির।
অবমুক্ত করা এসব কুমির কী অবস্থায় আছে- তার তথ্য নেই বন বিভাগের কাছে। এ প্রসঙ্গে হাওলাদার আজাদ কবীর বলেন, নদীতে ছাড়ার পর কুমির মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে ২০১৭ সালে দুটি, ২০১৮ সালে ৫টি এবং ২০১৯ সালে ৫টি কচ্ছপে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার লাগিয়ে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। প্রতিটি কচ্ছপ কোথায় যাচ্ছে- প্রতি ১৫ মিনিট পর পর জিপিএস লোকেশন পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাইমুল নাসের বলেন, এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে প্রজনন ঘটালে কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় প্রাণীর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায়। এ জন্য প্রাণীটি বড় করে কিছুটা নিরাপদ জায়গায় তাদের ছাড়া, যাতে নিজেরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবীর বলেন, নোনাপানির কুমির কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বংশবিস্তারের সুযোগ কমে যাওয়া। সুন্দরবনের নোনাপানির কুমির উঁচু জায়গায় ডিম পাড়ে। নির্দিষ্ট সময় শেষে বাচ্চা ফুটে বের হয়। কিন্তু বনের ভেতর এখন উঁচু জায়গা কমে গেছে। জোয়ারে অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। কৃত্রিম প্রজনন সফল হলেও বিপন্ন প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে হলে প্রাকৃতিক প্রজনন ফিরিয়ে আনা জরুরি।