Home Lead নগরীতে হত্যা মামলার আসামি উপ-পুলিশ কমিশনারের পাশে: পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না !

নগরীতে হত্যা মামলার আসামি উপ-পুলিশ কমিশনারের পাশে: পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না !

382


শামিম শিকদার।।


রেকর্ডপত্রে যিনি নির্মম হত্যাকাণ্ডের এজাহারনামীয় তালিকাভুক্ত আসামি, তাকেই নাকি ‘খুঁজে পাচ্ছে না’ পুলিশ! অথচ সেই ‘পলাতক’ আসামিই কি-না খোদ মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনারের (ডিসি) একদম গা ঘেঁষে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে আছেন! খুলনা মহানগরীর খালিশপুরে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় ডিসির পাশে হত্যা মামলার ৫ নম্বর আসামির এমন উপস্থিতির ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসায় গোটা নগরজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা, ক্ষোভ ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহলে।


কে এই প্রভাবশালী আসামি?
পুলিশের পাশে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো এই আসামির নাম শেখ মিস্টার খালিদ আহমেদ (৩৬)। তিনি খালিশপুর থানা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক এবং খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। একই সাথে তিনি সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের চাচাতো ভাগ্নে। রাজনৈতিক ও পারিবারিক এই বিপুল প্রভাবের কারণেই তিনি প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।


বুধবারের সেই চাঞ্চল্যকর দৃশ্য: স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে খুলনা মহানগরীর উত্তর কাশিপুর কবরস্থান রোড এলাকায় মমতাজ পারভীন নামে এক বৃদ্ধার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর বিভাগ) সুদর্শন কুমার রায়। সে সময় নিহতের বাড়ির সামনে উপস্থিত শত শত মানুষের ভিড়ে উপ-পুলিশ কমিশনার সুদর্শন কুমার রায়ের একদম পাশে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যুবলীগ নেতা ও হত্যা মামলার আসামি খালিদ আহমেদকে। এ সময় সেখানে খালিশপুর থানার ওসিসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও কেউ তাকে গ্রেফতারের কোনো উদ্যোগ নেননি।


যে মামলার ৫নং আসামি খালিদ: অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে খুলনা মহানগরীর খালিশপুর থানায় দায়ের করা রাজীব হোসেন হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত এই খালিদ আহমেদ। মামলার এজাহার (নম্বর- ২৬/১৬) অনুযায়ী, গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভিকটিম রাজীব হোসেনকে সুকৌশলে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে ভৈরব নদে ফেলে দেওয়া হয়। পরে ৯ জানুয়ারি পন্টন ঘাট সংলগ্ন ভৈরব নদ থেকে রাজীবের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ও সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের স্বজন ইয়াসিন মোল্যা বাদী হয়ে যে মামলা দায়ের করেন, তার ৫ নম্বর নামীয় আসামি হলেন এই শেখ মিস্টার খালিদ আহমেদ।


ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ:
রাজীব হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পুলিশ দাবি করে আসছিল, মামলার ৫নং আসামি খালিদ আহমেদসহ অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। কিন্তু বুধবারের এই ঘটনার পর পুলিশের সেই ‘অভিযান’ ও ‘পলাতক’ তত্ত্ব নিয়ে চরম হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।


নিহত রাজীবের পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা স্বজন হারিয়ে দ্বারে দ্বারে বিচার ভিক্ষা চাচ্ছি, আর পুলিশ বলছে খুনিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুনিরা পুলিশের বড় বড় কর্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। এই যদি হয় আইনের শাসন, তবে আমরা কার কাছে বিচার চাইব?”


খালিদের বক্তব্য: খালিশপুর থানায় দায়ের করা রাজীব হোসেন হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত এই খালিদ আহমেদ এর সাথে কথা বললে তিনি জানান, মামলায় তাকে হয়রানী মুলকভাবে আসামী করা হয়েছে। মামলায় জামিন নেয়নি। তবে তিনি সংবাদ পরিবেশন না করার জন্য অনুরোধ করেন।


পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা: একটি স্পর্শকাতর ও সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত/এজাহারভুক্ত আসামি কীভাবে প্রকাশ্যে একজন উপ-পুলিশ কমিশনারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পায় এবং পুলিশ কেন তাকে চেনার পরও গ্রেফতার করল না-তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল ধোঁয়াশা। স্থানীয়দের দাবি, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ভাগ্নে এবং বর্তমান কাউন্সিলর হওয়ায় এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় পুলিশ তাকে দেখেও ‘না দেখার’ ভান করছে, যা প্রকারান্তরে অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার শামিল।


এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট খুলনা অঞ্চলের নৌ-পুলিশ স্টেশনে ওসি বাবুল আক্তার বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলতে পারবেন মামলাটি বর্তমানে কোন অবস্থায় আছেন। কিন্তু মহিদুল ইসলামের মোবাইলে বার বার ফোন দেয়া হলেও তিনি মোবাইল ধরেননি।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর বিভাগ) সুদর্শন কুমার রায়কে ফোন দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি। নগরবাসী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে রাজীব হত্যা মামলার আসামি খালিদ আহমেদকে গ্রেফতার এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।