স্টাফ রিপোর্টার।।
শিল্পনগরী খুলনায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ছাদবাগান। নগরীর হাজারো বাড়ির মালিক তাঁদের ছাদে বাগান করেছেন। এতে রয়েছে দেশি-বিদেশি ফুল, ফল, শাকসবজি, ঔষধির পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনকারী নানা গাছ। শখ আর পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অনেকেরই এখন আয়ের পথ হয়ে উঠেছে ছাদবাগান।
নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর সড়কের ৬৬ নম্বর বাড়িতে চিংড়ি রপ্তানিকারক আবদুল জব্বার মোল্লার স্ত্রী মুর্শিদা আক্তার রনি ছাদে বাগান করেন ২০১৫ সালে। নিজের হাতে বাগানের পরিচর্যা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাজারে প্রাপ্ত বেশিরভাগ শাকসবজিতে সারসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। তাই শখের পাশাপাশি বিষমুক্ত শাকসবজি উৎপাদন করে পরিবারের চাহিদা মেটাতে এ বাগান তৈরি করি। এখন বাগানের সবকিছু আত্মীয়স্বজনকেও দিই। এই দিতে পারাটাও আনন্দদায়ক।
মুর্শিদার বাগানে রয়েছে কলা, লেবু, পেয়ারা, বাতাবি লেবু, আতা, পেঁপে, সফেদা, কমলা, মাল্টা, ব্ল্যাকবেরি, আমড়া, করমচা, আনারস, ড্রাগনসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। রয়েছে লাউ, বেগুন, আলু, শিম, পটোল, ডাটা, ঢ্যাঁড়শ, উচ্ছে, ঝিঙ্গা, পুঁইশাক, পাটশাক প্রভৃতি। আরও আছে গোলাপ, আদা, ত্বিন, অ্যালোভেরা, পুদিনাসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। সব মিলিয়ে তাঁর বাগানটিতে তিন শতাধিক প্রজাতির ফুল, ফল, সবজি ও শোভাবর্ধনকারী গাছ রয়েছে।
নগরীর নিরালা মোড়ে শেরেবাংলা রোডে প্রায় ২০ বছর আগে ২ হাজার বর্গফুট ছাদে বাগান করেন জাহের হাদী। তিনি জানান, প্রথমে ছাদে ফুলের বাগান তৈরি করেন। পরে ফল, শাকসবজি, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছ যোগ করেন। বর্তমানে তাঁর ছাদে শতাধিক প্রজাতির গাছ রয়েছে। পরিবারের ৬ সদস্যের শাকসবজির ৮০ শতাংশ চাহিদা মেটে এই ছাদবাগানের মাধ্যমে। এ ছাড়া এই বাগানে চারা ও কলম উৎপাদন করে তিনি বিক্রি করেন।
তাঁদের মতো নগরীর কয়েক হাজার বাড়িতে গড়ে উঠেছে ছাদবাগান। চাকরি বা অন্য কাজ শেষে অনেকের অবসর কাটে ছাদবাগানে গাছের পরিচর্যা করে। খুলনা সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ হোসেন শেখ জানান, গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি ২০১৪ সালে টুটপাড়া ছোট খালপাড় এলাকায় তাঁর বাড়ির ছাদে বাগান করেন। এ বাগানে ৫ প্রকার লেবু, ৪ প্রকার ড্রাগন, ৪ প্রকার বিদেশি আম, মাল্টা, নাশপাতি, বেল, সফেদা, পুঁইশাক, শিম, বরবটি, বেগুনসহ মৌসুমি সব শাকসবজি রয়েছে।
তিনি জানান, বাগানে জৈব সার ব্যবহার করেন। কীটনাশকের পরিবর্তে ফেরোমন ফাঁদের মাধ্যমে ফল ছিদ্রকারী পোকা দমন করেন। শখের ছাদবাগানের মাধ্যমে বিনোদনের পাশাপাশি ফুল, বিষমুক্ত ফল ও সবজি মিলছে। ঘরও ঠান্ডা থাকে। যাঁদের সময়-সুযোগ আছে, তাঁদের সবারই ছাদে বাগান করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
ছাদবাগানের আরেক সফল ব্যক্তি নগরীর রায়েরমহল এলাকার প্রভাষক শেখ শামসুদ্দীন দোহা। তাঁর বাগানে রয়েছে আম, তরমুজ, বেদানা, ডালিম, কাগজি লেবু, বাতাবি লেবু, মিষ্টিকুমড়াসহ শাকসবজি ও বাহারি ফুলগাছ। তিনি বলেন, ছুটির দিন ছাড়াও সময় পেলেই নিজের হাতে বাগানের পরিচর্যা করেন। ১৭০০ বর্গফুটের ছাদবাগানে প্রায় সব ধরনের শাকসবজি আছে, যা দিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটে যায়।
ছাদে বাগান করতে নতুন করে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক বাড়ির মালিক। নগরীর পুরোনো যশোর রোডের বরিশাল অপটিক্যালের মালিক হুমায়ুন কবীর কিছুদিন আগে তাঁর ছাদে বাগান করেছেন। তিনি জানান, আম, মাল্টা, জাম, আমড়া, লেবুসহ ৫০ প্রকার গাছ রয়েছে ছাদে। বাগান আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
খুলনার দুটি মেট্রোপলিটন কৃষি অফিসে প্রায় ৮০০টি ছাদবাগানের তালিকা রয়েছে। তবে তাঁদের তালিকার বাইরে রয়েছে বেশিরভাগ ছাদবাগান। নগরীর দৌলতপুর এলাকার মেট্রোপলিটন কৃষি কর্মকর্তা হুসনা ইয়াসমিন জানান, তাঁর আওতাধীন নগরীর ১ থেকে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৪০০টির মতো বাড়ির ছাদে বাগান রয়েছে।
খুলনার লবণচরা এলাকার মেট্রোপলিটন কৃষি কর্মকর্তা জেসমিন ফেরদৌস জানান, তাঁর আওতাধীন নগরীর ১৬ থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৪০০টি ছাদবাগান রয়েছে। তবে যাঁরা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা নেন, শুধু সেসব ছাদবাগানের তালিকা তাঁদের কাছে রয়েছে।
তিনি জানান, খুলনায় ২০০৫-২০০৬ সাল থেকে মূলত ছাদবাগান বাড়তে থাকে। সম্প্রতি অনেকেরই আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং নতুন নতুন ছাদবাগান গড়ে উঠছে। ছাদবাগানের মালিকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে কৃষি বিভাগ। তাঁরা ছাদে বাগান করার জন্য লোকজনকে উৎসাহিত করছেন।











































