Home কলাম বনজ সম্পদের টেকসই প্রবৃদ্ধি

বনজ সম্পদের টেকসই প্রবৃদ্ধি

14

  –মোঃ আতিকুর রহমান মুফ্তি

নগর জীবনে সবুজের ছোঁয়া লুপ্তপ্রায়। গ্রামাঞ্চলের সবুজও ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। কলকারখানা আর মানুষের আবাসস্থল নির্মানে বন,বাগান ও গাছপালা কেটে উজাড় করছি আমরা। দেশের ৬৪ জেলাতেই বায়ু দূষনের পরিমান বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার আদর্শমান হতে তিনগুন বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ^বিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী কেবল বায়ু দূষনের কারণেই দেশের মানুষের গড়আয়ু পাঁচ বছর চারমাস কমে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকার অধিবাসীদের ক্ষেত্রে এটা সাত বছর সাত মাস। সুতরাং মানুষের জীবন ও সভ্যতা রক্ষায় নির্মল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই। দূষণমুক্ত পরিবেশ পেতে জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার কমানো ও বৃক্ষরোপনের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সদিচ্ছা দরকার।

বাংলাদেশে সরকার নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এরমধ্যে বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১৬ লাখ হেক্টর যা দেশের আয়তনের প্রায় ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ । পাশাপাশি দেশে বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ২২দশমিক ৩৭ শতাংশ। উপকূলীয় চরাঞ্চলে বনায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের  প্রথম সফল দেশ। বন বিভাগ ষাটের দশক থেকে উপকূলীয় অঞ্চলে জেগে ওঠা চরে বনায়ন শুরু করেছে। চরগুলোতে সফল বনায়ন প্রক্রিয়ায় বনজ সম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি উপকূলবাসীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সৃষ্টি এবং সাগর থেকে জেগে ওঠা ভূমি দৃঢ়করণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে।

টেকসই বন ব্যবস্থাপনা ও বনজ সম্পদের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতের আরেকটি সফল উদাহরণ হলো সামাজিক বনায়ন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত এই বনায়ন কার্যক্রমে ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামীণ মানুষের আর্থ-সামাজিক সুবিধা নিশ্চিতের সাথে সাথে বনসৃজন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হয়।সামাজিক বনায়নের আওতায় সৃজিত বাগানের আবর্তকাল বা মেয়াদ কমপক্ষে ১০ বছর। স্ট্রিপ বাগান (রাস্তা বা রেললাইনের পাশে) প্রতি কিলোমিটারে  সর্বনি¤œ পাঁচ জন এবং উডলট, ব্লক বাগান, এগ্রোফরেস্ট্রি, উপকূলীয় চরভূমিতে প্রতি একরে একজন হিসেবে উপকারভোগী সম্পৃক্ত করা হয়। অধিকাংশ উপকারভোগী সৃজিত বাগানে অন্তরবর্তীকালীন ফসল হিসেবে আদা, হলুদ, আনারস, গম, চীনাবাদাম, কচু, লেবু, সবজি এবং ঔষধিগাছ ও অন্যান্য ফসল চাষ করে লাভবান হয়ে থাকেন। অংশীদারিত্বমূলক লভ্যাংশ বন্টন চুক্তি অনুযায়ী সামাজিক বন থেকে প্রথম ৭ বছর পর্যন্ত বনের প্রয়োজনে ছাঁটাই করা ডালপালা, ফলদ বৃক্ষের ফল , উৎপাদিত কৃষি ফসল ইত্যাদি থেকে প্রাপ্ত সকল আয়ের পুরোটাই উপকারভোগীরা পেয়ে থাকেন। বাগানের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে গাছবিক্রী হতে পাওয়া অর্থ উপকারভোগীদের মাঝে লভ্যাংশ চুক্তিনামা অনুযায়ী বন্টন করা হয়। এভাবে সামাজিক বনায়ন বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সেই সাথে পরিবেশের ভারসাম্যরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রশমন ও অভিযোজন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সামাজিক বনায়নের আওতায় ১৯৮১-১৯৮২ হতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে বনায়ন এবং ৭৩ হাজার ২২৩.৩৬ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান তৈরি করা হয়েছে। এসকল বাগানের ৭ লাখ এক হাজার ৪৮৮ জন উপকারভোগী সম্পৃক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী উপকারভোগীর সংখ্যা এক লাখ ৩৪ হাজার ৫৪২ জন। সামাজিক বনায়ন হতে ৪৩ হাজার ৯৪৩ হেক্টর বাগান এবং ১৮ হাজার ৩৬২ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান কর্তন করা হয়েছে। যার বিক্রয় মূল্য এক হাজার দুইশত ২৭ কোটি ৮২ লক্ষ ১৮ হাজার ৯৯০ টাকা। এপর্যন্ত এক লাখ ৯১ হাজার ৮৫৪ জন উপকারভোগীর মাঝে ৩৮৩ কোটি ২৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছর পর্যন্ত পুনঃবনায়নের কাজে বৃক্ষরোপণ তহবিলে ১১০ কোটি ২০ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৫ টাকা জমা হয়েছে । সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে সরকারের এপর্যন্ত রাজস্ব আয়ের পরিমান ৪৩৩ কোটি ৫৮ লাখ ৪৫ হাজার ২৩২ টাকা।

সুন্দরবনেও টেকসই বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপ্রধান বনজদ্রব্য আহরণ করা হয়ে থাকে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে ৮৬ হাজার ১৬৩ মন গোলপাতা আহরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৯ হাজার ১৬৩.৩২ মন মধু ও দুই হাজার ৭৪৯.২৮ মন মোম আহরণ করা হয়েছে। টেকসই বন ব্যবস্থার কারণে সরকার সুন্দরবনের গোলপাতা ও মধুর মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২০২০ সালে ৩২৭ টি উপজেলায় ৬৬ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৫ টি গাছ এবং সুফল প্রকল্পের আওতায় ১৬৫টি উপজেলায় ৩৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬২৫টিসহ মোট ১ কোটি গাছের চারা উত্তোলনপূর্বক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমান শতকরা ২৪ শতাংশে উন্নীত করতে বদ্ধপরিকর। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ১৫ নম্বর অভীষ্ট অর্জনে সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দেশের সব ধরণের বনাঞ্চলকে টেকসই ব্যবস্থাপনার আওতায় এনেছেন। বনায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সাথে সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করবে।

পিআইডি, ফিচার