Home আঞ্চলিক মুষ্টি চাল দিয়ে শুরু, মনোয়ারাসহ স্বনির্ভর শতাধিক নারী

মুষ্টি চাল দিয়ে শুরু, মনোয়ারাসহ স্বনির্ভর শতাধিক নারী

6

মনোয়ারা বেগম। একজন জনপ্রতিনিধি হলেও সে পরিচয় ছাপিয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। নারীদের সম্পৃক্ত অত্মকর্মসংস্থানের জন্য গড়ে তোলেন ‘জুঁই’ নামে একটি সমিতি। শুধু নিজে নয় গ্রামের নারীদের স্বনির্ভর করতে কাজ করে চলছেন মনোয়ারা।

মনোয়ারার নেতৃত্বে ওই গ্রামের নারীরা পতিত জমিতে সবজি চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তারা তাদের বাড়ির পাশে পতিত অকৃষি জমিতে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করে আয় করেন। প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার গ্রামের শতাধিক মহিলা জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত মৌসুমী সবজি ও বিভিন্ন ফসল সমিতির নির্ধারিত স্থানে জমা করেন। পরে সেগুলো ঢাকায় পাঠিয়ে বিক্রি করা হয়।

মনোয়ারা বেগম ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মেম্বার। তিনি ওই আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী।

স্থানীয় ও সমিতির একাধিক সদস্য জানান, ২০০২ সালে জাপান ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ মোস্তবাপুর গ্রামে কাজ শুরু করে। প্রজেক্টের ইনচার্জ শাহজাহান আলী বিপাশের সহযোগিতায় মনোয়ারা বেগম গ্রামের নারীদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন ‘জুঁই’ নামের একটি মহিলা সমবায় সমিতি। প্রথমে মুষ্টির চাল তুলে জমানোর সিদ্ধান্ত হয়। দুই বছর চাল জমিয়ে বিক্রি করে কেনা হয় পাওয়ার টিলার, সিডার মেশিনসহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। যা সদস্যরা নিজেদের কৃষিকাজে ব্যবহারের পাশাপাশি অন্যর কাজ করে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।

বর্তমানে এ সমিতির সদস্য ৮০ জন। তাদের সঞ্চয়ের প্রায় তিন লক্ষাধিক টাকার গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগীসহ বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজে বিনিয়োগ করেছেন। সমিতির সদস্যদের মধ্যে এসব বিতরণ করা হয়।

সম্প্রতি পরিবেশ বান্ধব জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদন, সম্প্রসারণ ও বাজারজাতসহ এলাকায় কর্মসংস্থানে অবদান রাখে মনোয়ারা। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কৃষিতে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। জাতীয় সবজি মেলা ২০১৮ বিশেষ সম্মাননা পান তিনি।

এ বিষয়ে ইউপি সদস্য ও নারী সংগঠক মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘গ্রামের দরিদ্র নারীরা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে মুষ্টি চাল নিয়ে সঞ্চয় শুরু করি। প্রথমে ২৫ জন নারী নিয়ে ‘জুঁই’ নামে সমিতি গঠন করি। তিন বছর পর ২০০৫ সালে ৪৩ হাজার টাকার চাল বিক্রি করি। আস্তে আস্তে সঞ্চয় বাড়তে থাকে আমাদের। এরপর সমিতির সদস্যের বাড়িতে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) তৈরি শুরু করেন। ফলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পাল্টে যায়।’

সমিতির সদস্য রাজিয়া বেগম বলেন, ‘গ্রামের কৃষিতে অবদান রাখার কারণে ২০০৪ সালের ইউপি নির্বাচনে গ্রামবাসীরা তাকে মহিলা মেম্বর নির্বাচিত করেন। এরপর সকলের সহযোগিতায় নিয়ামতপুর ইউনিয়নের মধ্যে তাদের গ্রামটিকে প্রথম শতভাগ স্যানিটেশনের গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলে পুরস্কার লাভ করেন। ফলে তার সমাজ সেবামূলক এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জয়ীতা সন্মাননা পান।’

মোস্তবাপুর গ্রামের গৃহিণী রাবেয়া বেগম জানান, ‘বাড়ির কাজের পাশাপাশি অবসরে তিনি বাড়ির পাশের পতিত জমিতে কলা, পুঁইশাক, লাশ শাক, কচু চাষ করেছেন। আর তার এ কাজে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন মনোয়ারা বেগম। জমিতে কোনো রাসায়নিক সার তিনি ব্যবহার করেন না। উৎপাদিত সকল সবজি মনোয়ারা বেগম কিনে নেন। সবজি চাষ করে আমার বাড়তি কিছু আয় হচ্ছে যা দিয়ে সংসারে কাজে লাগাতে পারছি।’

মস্তবাপুর গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামের মনোয়ারা বেগম নারীদের সংগঠিত করে গ্রামের কৃষি চাষ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছেন। তার নেতৃত্বে নারীরা গ্রামের পতিত জমিতে চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ফলে তাদের এমন কর্মকা-ে সমাজে নারীদের নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তাদের এখন অনেক সম্মান করে।’

হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের ইনচার্জ শাহজাহান আলী বিপাশ বলেন, ‘২০০২ সালে মোস্তবাপুর গ্রামের শতভাগ স্যানিটেশনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করি। পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে কৃষি নিয়ে কাজ করি। সে সময় গ্রামের নারী সংগঠক মনোয়ারাকে সাথে নিয়ে গ্রামের নারীদের সংগঠিত করা হয়। তখন থেকেই তারা তাদের ভাগ্য উন্নয়নে চেষ্টা করছে এবং তারা সফল হয়েছে।’

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার শিকদার মোহাইয়েন আক্তার বলেন, ‘মনোয়ারা বেগমের বাড়িতে তিনি গেছেন। তার বিষমুক্ত সবজির বাজার দেখেছেন। মনোয়ারা বেগম গৃহিণীদের কাছ থেকে সবজি কিনে ঢাকা শহরে পাঠাচ্ছেন অবশ্যই এটি ভাল।’

-ঝিনাইদহ প্রতিনিধি