Home খেলাধুলা ছেলের অটিজম শনাক্তের পর যেভাবে বদলে গেল বিশ্বকাপজয়ী কুকুরেয়ার জীবন

ছেলের অটিজম শনাক্তের পর যেভাবে বদলে গেল বিশ্বকাপজয়ী কুকুরেয়ার জীবন

1

স্পোর্টস ডেস্ক।।

মাঠে নামলেই দূর থেকে নজর কেড়ে নেয় কোঁকড়ানো চুল আর অদম্য প্রাণশক্তি। মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অক্লান্ত ছুটে চলা এই ফুটবলার আর কেউ নন; স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া।

সম্প্রতি ইংলিশ ক্লাব চেলসি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া ২৮ বছর বয়সী এই তারকা চেলসি ও স্পেনের হয়ে যেমন সাফল্য কুড়িয়েছেন, তেমনি তার গোল উদযাপনের ধরনও ভক্তদের কাছে সমান জনপ্রিয়।

গোল করার পর পেঙ্গুইনের মতো লাফিয়ে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে উদযাপন করেন কুকুরেয়া। তবে এই উদযাপনের পেছনে রয়েছে এক গভীর পারিবারিক বার্তা।

এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেটে দেখেছিলাম, পেঙ্গুইন একবার সঙ্গী বেছে নিলে সারাজীবন তার সঙ্গেই থাকে। পরিবারের সঙ্গে তাদের বন্ধন অটুট থাকে। তাই আমার এই উদযাপন পরিবারের জন্য। ভালো-খারাপ সব সময় তারা আমার পাশে থেকেছে।’

স্প্যানিশ এই ডিফেন্ডারের জীবনসঙ্গী ক্লদিয়া রদ্রিগেস এবং এই দম্পতির ঘরে রয়েছে তিন সন্তান; মাতেও, রিও ও বেলা। কুকুরেয়া সবসময়ই মনে করেন, ফুটবলের আলোর চেয়েও তার কাছে তার পরিবার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তে পুরো বিশ্ব স্প্যানিশ ফুটবলারদের নিখুঁত ও চমৎকার জীবনের রূপটাই দেখেছে। কিন্তু বাইরে থেকে জীবন যতই নিখুঁত মনে হোক না কেন, তাদেরও যে সাধারণ মানুষের মতো প্রতিদিনের ‘ব্যক্তিগত সমস্যা’ ও মানসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সে কথা অকপটে স্বীকার করেছেন কুকুরেয়া।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটি বড় ছেলে মাতেওকে নিয়ে। মাত্র তিন বছর বয়সে মাতেওর ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার’ (এএসডি) ধরা পড়ে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় লেভেল-১ বা প্রাথমিক পর্যায়ের মৃদু অটিজম হিসেবে চিহ্নিত। সাধারণত এই ধরনের বিকাশজনিত অবস্থায় শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ, কথা বলা বা মানুষের সঙ্গে সহজে মেলামেশা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

স্পেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবেগাপ্লুত কুকুরেয়া বলেন, ‘আমার বড় ছেলে আমাদের সবার জীবনই কিছুটা বদলে দিয়েছে। ও যখন নার্সারিতে যাওয়া শুরু করল, তখনই আমরা ওর মাঝে কিছু ভিন্ন বিষয় লক্ষ্য করতে শুরু করি। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলার যেসব ছবি আসত, সেখানে প্রায় সবসময়ই দেখা যেত যে ও একা আছে। ও একটু বড় হওয়ার পর দেখলাম, ও কথা বলছে না, আধো আধো শব্দও করছে না। ওই সময়টাই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন ছিল। নিজের সন্তানকে কষ্ট পেতে দেখার চেয়ে কঠিন আর কিছু নেই।’

শুরুর দিকে ছেলে যে স্কুলে পড়ত, সেখান থেকে খুব একটা সহায়তা পাননি বলে জানান কুকুরেয়ার স্ত্রী ক্লডিয়া রদ্রিগেজ। কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘স্কুল থেকে আমরা খুব একটা সহায়তা পাইনি। জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম মাসের মধ্য দিয়ে গেছি আমরা তখন। প্রতিদিন আমরা দুজন একসঙ্গে মাতেওকে স্কুলে পৌঁছে দিতাম, আর বাড়ি ফিরতাম কাঁদতে কাঁদতে। প্রতিটা দিন।’

ছেলের অটিজম নিয়ে কথা বলা এখনো কুকুরেয়ার জন্য সহজ নয়, তবে এই কঠিন পরিস্থিতি তাকে জীবনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শিখিয়েছে। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিলেন যে আপনার সন্তানের অটিজম আছে, ঠিক আছে। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আমরা তো এর জন্য প্রস্তুত থাকি না। তাই আমাদের অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। সম্ভবত মাতেও-ও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে জীবনের কোনো বিষয়গুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ আর কোনগুলো নয়, সেগুলোকে মূল্য ও অগ্রাধিকার দেওয়া শিখিয়েছে।’

খেলার মাঠে নিজের বিশাল পরিচিতিকে তিনি কাজে লাগাতে চান অন্য অটিজম আক্রান্ত পরিবারের উপকারে। কুকুরেয়া বলেন, ‘আমাদের যে পরিচিতি আছে, তা যদি এই বিষয়টিকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে এবং আরও পরিবারকে সাহায্য করতে পারে, তাহলে আমি খুবই খুশি হব। এর ফলে যদি আরও স্কুল, সহায়তা ও সাপোর্ট সেন্টার গড়ে ওঠে, সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের অনেক সময় জনাকীর্ণ বা চরম আবহাওয়াযুক্ত পরিবেশে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র গরম থেকে ছেলেকে মুক্ত রাখতে ফাইনালের আগে বিশেষ যত্ন নিতে হয়েছে পরিবারকে। কুকুরেয়া জানান, ‘যুক্তরাষ্ট্রে খুব গরম। এতে ওর অস্বস্তি হয়। ও ঠান্ডা পরিবেশ পছন্দ করে; যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা সুইমিং পুল আছে।’

২৪-এর ইউরো জয়ের মতোই এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালেও স্পেনের ঐতিহাসিক ট্রফি জয়ের মুহূর্তে মাঠে উপস্থিত থেকে বাবার বিশ্বজয়ের সাক্ষী থেকেছে মাতেও। ফুটবল মাঠের শিরোপার চেয়েও প্রতিদিনের জীবনের এই ভালোবাসার লড়াই কুকুরেয়াকে একজন সত্যিকারের বীরের মর্যাদায় বসিয়েছে।