Home আঞ্চলিক অস্ত্র-মাদক-আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুলনায় বাড়ছে হত্যাকান্ড, ছয় মাসে নিহত ৪৩

অস্ত্র-মাদক-আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুলনায় বাড়ছে হত্যাকান্ড, ছয় মাসে নিহত ৪৩

43

স্টাফ রিপোর্টার।।


খুলনায় গুলি, খুন ও সহিংসতাসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলায় খুন হয়েছেন ৪৩ জন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান চললেও কমছে না সহিংসতা। খুন ও অবৈধ অস্ত্রের দাপট বাড়ায় উদ্বেগও বাড়ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না, অপরাধের মূল উৎস বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।


স্বজনদের কান্না আর আহাজারি যেন খুলনার পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাবার কান্না, বুকের ধন হারিয়ে মায়ের আর্তনাদ; গত কয়েক মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা বারবার ঘটেছে।


চলতি বছরের মার্চে খুলনা নগরীর ডাকবাংলো মোড়ে একটি জুতার দোকানে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় এক ব্যবসায়ীকে। জুনে দৌলতপুরে ফজরের নামাজের পর মসজিদের ভেতরে ঢুকে দুজনকে গুলি করা হয়।


গত এপ্রিল মাসে পারিবারিক কলহের জেরে নানি ও তার দুই নাতিকে হত্যার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি এক সাংবাদিককে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। শুধু এসব নয়, প্রায় প্রতিদিনই খুলনা মহানগর ও জেলার কোথাও না কোথাও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার, অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুন, গুলি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে অশান্ত ছিল খুলনা। এ সময়ে মহানগর ও জেলায় মোট ৪৩ জন খুন হয়েছেন। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৭টি মামলায় ৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া ২৫৭টি মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন ৩৫৭ জন।

এসব ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি। এছাড়া স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, জমি ও ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার থেকেও সহিংসতা ঘটছে।


এতে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। সোনাডাঙ্গার বাসিন্দা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, আগে রাত পর্যন্ত বাইরে থাকলেও এত ভয় লাগত না। এখন পরিবারের কেউ বাইরে থাকলে সব সময় দুশ্চিন্তা হয়। একের পর এক খুন ও গুলির ঘটনায় মানুষ আতঙ্কে আছে।

দৌলতপুরের ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম বলেন, ব্যবসা শেষে রাতে বাড়ি ফিরতে ভয় লাগে। পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার, যাতে অপরাধীরা বুঝতে পারে তারা নজরদারির মধ্যে রয়েছে।

খালিশপুরের বাসিন্দা রেহানা বেগম বলেন, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অপরাধের খবর শুনতে হয়। সন্তানদের বাইরে পাঠালেই ভয় কাজ করে। অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গ্রেফতার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। খুলনা নাগরিক ফোরামের মহাসচিব এস এম ইকবাল হাসান তুহিন বলেন, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের মূল উৎস বন্ধে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের প্রবণতাও কমবে।

মহানগরের বিভিন্ন অপরাধে কয়েকটি নির্দিষ্ট গ্রুপের নাম ঘুরে ফিরে এলেও পুলিশের দাবি, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। খুলনা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, সবশেষ দুই মাসে আগের চার মাসের তুলনায় হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা কিছুটা কমেছে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং সব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, মাদক, অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।

ছয় মাসে শত শত গ্রেফতার, নিয়মিত অভিযান এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম চললেও খুলনায় খুন ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি থামছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শুধু অপরাধীদের গ্রেফতার নয়, তাদের অর্থের উৎস, মাদক সিন্ডিকেট, অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ এবং সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক ভাঙতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন কি না।

বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর অভিযান চালানোর চেয়ে অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই খুলনায় সহিংসতা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।