মিলি রহমান।।
হাড় মজবুত করতে দুধ অবশ্যই সাহায্য করে। তবে কেবল দুধ কিংবা হাড়ের স্যুপ খেলেই হাড় শক্ত হয় না। সাধারণ স্যুপে খুব সামান্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে, তাই এটি হাড় শক্ত করার মূল চাবিকাঠি নয়। আবার অনেকের ধারণা— গরু কিংবা খাসির হাড়ের স্যুপ খেলে হাড় মজবুত হয়। অনেকেই মন করেন হাড়ের নিহারি বা স্যুপ খেলেই হাড় শক্ত হয়ে যাবে। আসলে তা ঠিক নয়।
এ বিষয়ে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞদের মতে— ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি, প্রোটিন, হরমোনের ভারসাম্য ও নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। দুধে প্রচুর ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে ও ক্ষয়রোধে কাজ করে থাকে। তবে যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স (দুধ হজমের সমস্যা) আছে, অতিরিক্ত দুধ খেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
আর ক্যালসিয়াম হাড়ের গঠন তৈরি করলেও, ভিটামিন ডি ছাড়া শরীর তা শোষণ করতে পারে না। তাই রোদে থাকা ও ভিটামিন ডি-যুক্ত খাবার গ্রহণ জরুরি। ক্যালসিয়ামের জন্য শুধু দুধের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, দই, পনির ও বাদাম থেকেও হাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। পুষ্টির পাশাপাশি হাঁটা, দৌড়ানো বা ওজন বহনকারী ব্যায়াম হাড়কে প্রাকৃতিকভাবে মজবুত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ভিন্নকথা বলছেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের চিকিৎসক আব্দুর রহমান বলেন, হাড়কে সুস্থ ও মজবুত রাখতে শুধু ক্যালসিয়ামই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি ভিটামিন ডি, পর্যাপ্ত প্রোটিন, শরীরের বিভিন্ন হরমোনের সঠিক কার্যকারিতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলেই হাড় শক্ত হবে বিষয়টি এমন নয়।
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় অনেকেই জানেন না— হাড়ের স্যুপে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ খুব বেশি থাকে না। সাধারণভাবে রান্না করা হাড় থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম স্যুপে আসে না। তাই ‘হাড়ের স্যুপ খেলে হাড় শক্ত হয়’ এমন ধারণার পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
হাড় মজবুত রাখতে খাদ্যতালিকার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. আব্দুর রহমান। হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন—
১. দুধ, দই ও পনির।
২. ছোট মাছ (কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন) ও ডিম।
৩. পালংশাক, কলমি শাকসহ সবুজ শাকসবজি।
৪. তিল ও বাদাম
৫. ডাল ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
আর ভিটামিন ডির জন্য প্রতিদিন সকাল বা বিকালের নরম রোদে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট থাকা উপকারী। এ ছাড়া তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার থেকেও এ পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। হাড় শক্ত ও সুস্থ রাখতে চিকিৎসক কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
সেগুলো হলো—
১. নিয়মিত হাঁটুন কিংবা ওজন বহন করে এমন ব্যায়াম করুন।
২. ধূমপান পরিহার করুন।
৩. অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
৪. পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি নিশ্চিত করুন।
ডা. আব্দুর রহমান আরও বলেছেন, সবার হাড় সমান ঝুঁকিতে থাকে না। বেশি ঝুঁকিতে আছেন ৬৫ বছরের বেশি নারী, ৭০ বছরের বেশি পুরুষ কিংবা যাদের সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙেছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে বোনে মিনারেল ডেনসিটি (বিএমডি) পরীক্ষা করাতে পারেন। তিনি বলেন, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট বা সাপ্লিমেন্ট নিজে নিজে খাওয়া উচিত নয়। সবার ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন এক নয়। অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথরসহ অন্যান্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম গ্রহণ করাই নিরাপদ।
হাড়ের ক্ষয় নীরবে হয়। এর লক্ষণ দেরিতে প্রকাশ পায়। তাই লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে আগে থেকেই সচেতন হওয়া উচিত। এমন অনেকেই আছেন যারা হাড় ক্ষয়ের সমস্যায় ভোগেন। এর পেছনের কারণ নিয়ে জানতে চাইলে ডা. আব্দুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারণে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয় হতে পারে। অস্টিওপোরোসিসকে ‘নীরব রোগ’ বলা হয়। কারণ শুরুতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিতে পারে
১. কোমর বা পিঠে ব্যথা
২. সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়া
৩. উচ্চতা কমে যাওয়া
৪. পিঠ বাঁকা হয়ে যাওয়া
৫. দীর্ঘদিনের হাড়ের দুর্বলতা









































