Home খেলাধুলা যে বিশ্বকাপ মেসি না জিতলেও চলবে!

যে বিশ্বকাপ মেসি না জিতলেও চলবে!

2

স্পোর্টস ডেস্ক।।

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, ৩৮ বছর বয়স এবং ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ফিফা বিশ্বকাপ। লিওনেল মেসি ২০২৬ সালের এই ফুটবল বিশ্বকাপে এমন এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে পা রাখছেন, যেখানে ইতিহাসের কোনো ফুটবলার এর আগে কখনো পৌঁছাতে পারেননি।

সমস্ত চাপ আর দায়বদ্ধতার ওপাড়ে গিয়ে, কোনো ঋণ বা নিজেকে প্রমাণ করার তাড়না ছাড়াই এবার তিনি বিশ্বমঞ্চে হাজির। লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই অবিস্মরণীয় রাতের পর থেকে ফুটবলকে দেখার তার দৃষ্টিভঙ্গিটাই পুরো বদলে গেছে।

আর প্রচণ্ড মানসিক চাপের এই আধুনিক ফুটবলে মেসির এই নির্ভার রূপটিই যেন এক নীরব বিপ্লব। ২০২২ সালের ১৮ই ডিসেম্বরের সেই রাতে লুসাইল স্টেডিয়ামের উত্তাপ ফুটবল বিশ্ব আগে খুব কমই দেখেছে।

সেদিন ৩৫ বছর বয়সী মেসি যখন চোখ বন্ধ করে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কোনো স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পর তিনি ভয়ে চোখ খুলছেন না; পাছে চোখ খুললেই যদি সেই স্বপ্ন উধাও হয়ে যায়।

সেই দীর্ঘ ফাইনালটি কেবল একটি শিরোপা নির্ধারণ করেনি, বরং মেসির ভেতরের এক বিশাল শূন্যতা ও দায় মিটিয়ে দিয়েছিল।

বছরের পর বছর ধরে একদল মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের দাবির নামে তার ওপর যে অন্যায্য চাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই রাতে তার অবসান ঘটে। সেই রাতটি একটি যুগের সমাপ্তি টেনেছিল, আর এরপর যা শুরু হয়েছে তা সম্পূর্ণ নতুন এক গল্প।

উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে ফুটবল বিশ্বে যে বড় প্রশ্নটি ঝুলছিল, তার অবসান ঘটিয়ে মেসি নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে তিনি খেলছেন। তবে এই নিশ্চিতকরণ বিতর্কের অবসান ঘটায়নি, বরং এক নতুন ও আকর্ষণীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়টি কোনো কিছু প্রমাণ করার তাগিদ ছাড়াই বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন।

২০২৬ সালের মেসি এমন এক অনন্য ফেনোমেনন যাকে কোনো গণ্ডিতে ফেলা কঠিন। তিনি নিজের উত্তরাধিকার বা লেগাসি সম্পূর্ণ করার জন্য এবার খেলছেন না, কারণ তা ইতিমধ্যেই কাতারেই অমর ও অক্ষত হয়ে গেছে। তিনি এবার ফিরেছেন একেবারেই মানবিক এক কারণে; কারণ তিনি খেলতে চেয়েছেন। এত চড়াই-উতরাইয়ের পর একজন এলিট অ্যাথলেটের জন্য কেবল ‘নিজের ইচ্ছায়’ খেলতে চাওয়াটাই হলো স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ।

কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মেসির সেই চেনা বিষণ্ণতা বা অদৃশ্য চাপের মুখাবয়ব আর দেখা যায় না। যা একসময় বাধ্যবাধকতা ছিল, তা এখন স্রেফ ইচ্ছায় পরিণত হয়েছে; যা ছিল চাপ, তা এখন এক পরম প্রিভিলেজ বা অধিকার।

২০২৫ মৌসুমে ইন্টার মায়ামির হয়ে তার পরিসংখ্যান সব যুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখায়: নিয়মিত মৌসুমে ২৯টি গোল ও ১৯টি অ্যাসিস্ট করে তিনি জিতেছেন এমভিপি (মোস্ট ভেলুয়েবল প্লেয়ার) ও গোল্ডেন বুট। এরপর প্লে-অফে মাত্র ৬ ম্যাচে ৬ গোল ও ৭ অ্যাসিস্ট করে ক্লাবকে এনে দিয়েছেন প্রথম এমএলএস কাপের শিরোপা। এটি কোনো ফুরিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়ের শেষ আর্তনাদ নয়, বরং একজন ফুটবল ঈশ্বরের নিখুঁত ও শান্ত পদচারণা।

গত ডিসেম্বরের এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি দিন ধরে ধরে এগোই, নিজের প্রতি সৎ এবং বাস্তববাদী থাকার চেষ্টা করি। যখন ভালো বোধ করি, উপভোগ করি। যখন করি না, তখন আমি সেখানে না থাকাই পছন্দ করি।’ এখানে কোনো নাটকীয় বিদায়ের ঘোষণা নেই, আছে শুধু অনুমতি ছাড়া নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেওয়া এক মানুষ।

একটা সময় ছিল যখন আর্জেন্টিনার জার্সি ও মেসির সম্পর্কটা ছিল এক চাপা উত্তেজনার; যেখানে গভীর ভালোবাসা থাকলেও ছিল না পাওয়ার ক্ষত আর ভারী নীরবতা। কাতার ২০২২ কেবল তাকে ট্রফি দেয়নি, তাকে তার দেশের মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসার ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ মেসিকে একা আর্জেন্টিনার বোঝা টানতে হয় না, বরং পুরো আর্জেন্টিনা তাকে পরম মমতায় আগলে রাখে।

কোচ লিওনেল স্কালোনি এমন এক দল গড়েছেন যা মেসিকে ছাড়াও জিততে পারে, তবে মেসিকে সঙ্গে নিয়ে তারা হয়ে ওঠে আরও বহুগুণ শক্তিশালী। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল এককভাবে মেসির কাঁধে ভর করে, যেখানে তার প্রতিভা দলকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সম্ভাবনার শেষ সীমা পর্যন্ত।

কিন্তু ২০২৬ সালে সমীকরণ বদলে গেছে: আর্জেন্টিনা এখন মেসিকে ছাড়াও চলতে পারে, তবে তারা মেসিকে সাথে নিয়েই চলতে চায়। পরনির্ভরশীলতা আর চাওয়ার মাঝখানের এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকুই মেসিকে তার সেরা রূপে ফুটিয়ে তুলেছে।

ফুটবলের স্মৃতি বড় দীর্ঘ। পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতে ফুটবলকে ব্রাজিলের নিজস্ব শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। ম্যারাডোনা জিতেছিলেন মাত্র একটি বিশ্বকাপ, কিন্তু মেক্সিকোর মাটিতে ‘হ্যান্ড অব গড’ আর পুরো দেশের আকাশসম চাপ কাঁধে নিয়ে জেতা সেই একটি শিরোপাই তাকে ফুটবল বিশ্বে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। মেসি নিজের মহাকাব্য লিখেছেন কাতারে, এক নতুন প্রজন্মের সাথে যারা তাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে জড়িয়ে ধরেছে।

এটি মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, যা ফুটবল ইতিহাসে এক সম্পূর্ণ কুমারী ভূমি। আন্তোনিও কারভাহাল, লোথার ম্যাথুস, রাফায়েল মার্কেজ সবাই থেমেছেন পাঁচটিতে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও এই বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ আসর স্পর্শ করবেন। এক অবিশ্বাস্য যুগের দুই মহানায়ক একসঙ্গে ফুটবলের দীর্ঘতম ও সেরা চক্রটির সমাপ্তি টানতে যাচ্ছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি খেলবেন, তা নিশ্চিত। তবে তিনি এই আসরটি কীভাবে উপভোগ করবেন, তা এখনো অলেখা। কোনো ঋণ নেই, কোনো বিচার বা সমালোচনার ভয় নেই; কেবল একজন মানুষ যিনি সবকিছুর ওপাড়ে গিয়ে খেলাটি চালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও সত্য কারণটি খুঁজে পেয়েছেন। এত সব পাওয়া আর দেওয়ার পর ফুটবল কিন্তু মেসির কাছে এখনো ঋণী; তবে কোনো শিরোপার জন্য নয়, শুধু বিশ্বমঞ্চে তার আরও একটি ম্যাচের সৌন্দর্যের জন্য।