দেড় বছরে ৬৫ খুন শতাধিক গুলিবর্ষণ
স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা মহানগরীতে আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারিকে কেন্দ্র করে প্রায় সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনা ঘটছে। প্রতিনিয়ত খুন-জখম ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। নগরীর চিহ্নিত ১৮১ সন্ত্রাসীর দাপটে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) নড়েচড়ে বসেছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।
বুধবার কেএমপি সদর দপ্তরে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ অপরাধ সভায় নগরজুড়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেএমপির গোয়েন্দা শাখার তথ্য অনুযায়ী-মহানগরীর আটটি থানায় ১৮১ জন সন্ত্রাসী, ৫৮৪ জন মাদক বিক্রেতা ও ৬৯ জন চাঁদাবাজের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। থানাভিত্তিক তালিকায় লবণচরা থানায় সবচেয়ে বেশি ৪৫ জন সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। খালিশপুর থানায় ৩৬ জন এবং দৌলতপুর থানায় ৩১ জন।
এছাড়া সদর থানায় ২৭ জন, সোনাডাঙ্গায় ২০ জন, আড়ংঘাটায় ১৫ জন, হরিণটানায় চারজন এবং খানজাহান আলী থানায় দুইজন সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে পুরনো ও নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ। বিশেষ করে লবণচরা, খালিশপুর, দৌলতপুর ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। লবণচরা থানার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো বেপরোয়া তৎপরতা চালিয়ে আসছে। জমি দখল, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বাহিনীগুলোর সদস্যরা অহরহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাং ও বড় সন্ত্রাসী চক্রের হয়ে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী-আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায় প্রতি রাতে ছয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়। মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনাকে কেন্দ্র করে বাহিনীগুলো গড়ে উঠেছে। গ্রুপগুলো হলো-গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, চরমপন্থি হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, পলাশ বাহিনী, নুর আজিম বাহিনী ও দৌলতপুর এলাকার আরমান বাহিনী। আরমান ও নুর আজিম কারাগারে থাকলেও সেখান থেকে তারা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
সন্ত্রাসীদের কাছে অত্যাধুনিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। মাসে শতকোটি টাকার মাদক বাণিজ্য ও এলাকার প্রভাব বিস্তারে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত কয়েক মাসে অর্ধশত মানুষ খুন হয়েছে। মহানগরীর ৩০২টি বস্তিতে দুজন করে প্রশিক্ষিত শুটার রয়েছে। এছাড়া এসব বস্তিতে গড়ে চারজন করে নারী মাদক বিক্রেতা রয়েছে। যারা খুবই ভয়ানক। এ কারণে খুলনাঞ্চলজুড়ে বিরাজ করছে আতঙ্ক।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে মহানগরীতে ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭টিতে। চলতি বছরের ৩ জুন পর্যন্ত আরও ১৭ জন খুন হয়। অর্থাৎ গত দেড় বছরে মহানগরীতে ৬৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গুলিবর্ষণ ও কুপিয়ে জখমের কেএমপি কমিশনার জাহিদুল হাসান বলেন, কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
খুলনা মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে অনেক অপরাধী জামিনে বের হয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। জোড়া খুনের দুদিন আগে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল চরমপন্থি দলের দুই নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম এবং আরমান ওরফে আরমান শেখ। দৌলতপুরের আরেক সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নাসিম। আরমান উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে আত্মগোপন করেছিল।
খুলনার নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, তালিকাভুক্ত ১৮১ সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান এবং রাজনৈতিক-সামাজিক আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।








































