স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার ছাড়াই নির্মাণকাজ এবং নিয়োগে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ ঘিরে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব অনিয়মের কারণে ঐতিহ্যবাহী এ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নগরীর শিরোমণি এলাকায় অবস্থিত হাসপাতালটিতে দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। প্রতিমাসে প্রায় দুই হাজার রোগীর ছানি অপারেশনসহ চক্ষু চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় এখানে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাস্টি বোর্ডকে ঘিরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ বিরোধে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯-২০ সাল থেকে তৎকালীন সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের অধীনে একটি ট্রাস্টি বোর্ড হাসপাতালটি পরিচালনা করে আসছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বোর্ড ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে একাধিক দফায় ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়।
পরবর্তীতে ২৪ অক্টোবর গঠিত ১১ সদস্যের নতুন কমিটিতে ড্যাব নেতা ডা. রফিকুল হক বাবলুকে চেয়ারম্যান এবং জামায়াত নেতা মুন্সী মঈনুল হককে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। এ কমিটিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতার আত্মীয়সহ একাধিক ব্যক্তি স্থান পাওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন ট্রাস্টি বোর্ডের প্রভাবে হাসপাতালের বিভিন্ন উন্নয়নকাজ টেন্ডার ছাড়াই পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে করা হয়। রান্নাঘরের ওপর অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং গ্যারেজ নির্মাণকাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি বাৎসরিক ওষুধ কেনাকাটা ও ওটি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে কর্মচারীদের অভিযোগ।
এছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বয়সসীমা লঙ্ঘন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা সেবায় বৈষম্যের অভিযোগও উঠেছে—বিশেষ কিছু রোগীকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হলেও সাধারণ স্টাফদের ক্ষেত্রে ছাড় সীমিত রাখা হচ্ছে।
অভিযোগ আরও রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কিছু কর্মচারীকে শোকজ এবং চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিবেশও নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডকে ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। একাধিক রাজনৈতিক পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং হস্তক্ষেপের অভিযোগে ট্রাস্টি বোর্ডের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
হাসপাতালের সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, “ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্তেই বিভিন্ন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। কিছু নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও বোর্ডের নির্দেশে হয়েছে।”
নতুন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক শীতেশ ব্যানার্জি বলেন, “এ বিষয়ে কোনো সরকারি চিঠি বা নির্দেশনা আমার কাছে এখনো আসেনি।”
অন্যদিকে খুলনা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, “হাসপাতালটির নিবন্ধন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত। ১৯৮৬ সালের পর থেকে কোনো অনুমোদিত কমিটি বা হালনাগাদ নথি আমাদের কাছে জমা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।”
সবমিলিয়ে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অস্থিরতায় খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা সেবা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো ও নিয়মিত তদারকি না হলে এ ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।










































