Home Lead খুলনা ওয়াসায় দুর্নীতির মহাসড়ক: বদলির পরেও এমডির পদোন্নতি বাণিজ্য

খুলনা ওয়াসায় দুর্নীতির মহাসড়ক: বদলির পরেও এমডির পদোন্নতি বাণিজ্য

62


শামিম শিকদার।।


খুলনা ওয়াসায় (পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ) চরম বিশৃঙ্খলা, সীমাহীন দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনের নজিরবিহীন জুলুম-নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং খোদ বদলির আদেশ জারির পরেও কোটি কোটি টাকার পদোন্নতি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. কামরুজ্জামান এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি, অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালা ওয়াসা ভবনকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন বলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে উপহাস ও কর্মচারীদের ওপর দমনপীড়ন: অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর খুলনা ওয়াসার ডিএমডি (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালা ওয়াসা ভবনে প্রীতিভোজ ও মিষ্টি বিতরণ করেন। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বসে এমন অসংবেদনশীল ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানায় ‘খুলনা ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়ন’।


এই প্রতিবাদের পর থেকেই কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাদের ওপর নেমে আসে প্রশাসনের খড়্গ। ডিএমডি ঝুমুর বালা নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাদের বিরুদ্ধে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে এবং ভুল কর্তৃপক্ষ দ্বারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ ও বিভাগীয় মামলা জারি করেন। বর্তমানে চাকরিচ্যুত করার ক্রমাগত হুমকি দিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের মাঝে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে।


হাজিরা খাতায় জালিয়াতি ও বিচারাধীন মামলায় অহেতুক হয়রানি: অভিযোগ রয়েছে, ডিএমডি ঝুমুর বালা নিজের হেফাজতে হাজিরা খাতা আটকে রেখে জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন। কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. রবিউল ইসলাম অফিশিয়াল ছুটিতে থাকার পরেও তাকে অন্যায়ভাবে ‘অনুপস্থিত’ দেখানো হয়েছে।


শুধু তাই নয়, পাম্প অপারেটর গোলকনাথ দে-র সাময়িক বহিষ্কারের বিষয়টি যেখানে আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য ও বিচারাধীন, সেখানে তাকে অন্যায়ভাবে নতুন করে বিভাগীয় মামলা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সহকারী পাম্প অপারেটর সৈয়দ জুলফিকারসহ একাধিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও অহেতুক শোকজ ও ভুল ব্যাখ্যার বিভাগীয় মামলা দিয়ে চরমভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, ঝুমুর বালার এই সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে গত ২৩/০৪/২০২৬ তারিখে খুলনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।


রুম ডেকোরেশনের নামে ৩০ লাখ ও বিবিধ খরচে কোটি টাকা আত্মসাৎ: খুলনা ওয়াসার এমডি মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপের পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিজের অফিস কক্ষ সাজানোর (রুম ডেকোরেশন) নামে পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে ৩০ লক্ষ টাকার ভুয়া ভাউচার করে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। এছাড়া ওয়াসার সরকারি টাকায় কেনা ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের ফুলদানি ও ওয়ালেট আর্ট তিনি নিজের বাসায় নিয়ে গেছেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় টিভি কিনেছেন এবং ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে কোটি টাকার অধিক অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। রাষ্ট্রের এই সংকটময় মুহূর্তে এটি চরম অপচয় ও অর্থ তছরুপের শামিল। নিজেকে ‘রাজা’ জাহির করতে ওয়াসার অর্থ অপচয় করে একটি সিংহাসন সদৃশ বিলাসবহুল চেয়ার তৈরি করিয়েছেন এবং একই চেয়ারে তিনটি বালিশ দিয়ে ‘সিংহাসন’ বানিয়ে বসেন।


নথি অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের নামে দুইবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও যোগ্য ব্যক্তিদের ডাকা হয়নি। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকারও বেশি খরচ দেখানো হয়েছে, যা অন্য যেকোনো ওয়াসার চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি এবং সম্পূর্ণ অর্থ লুটপাটের শামিল। এছাড়া বিবিধ খরচের নামে মো. কামরুজ্জামান কর্মরত থাকা অবস্থায় অদ্যবধি কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন।


১৬০০ মিটার চুরি ধামাচাপা ও জ্বালানি তেলের হরিলুট: খুলনা ওয়াসার ১,৬০০ পানির মিটার চুরির ঘটনায় তদন্তের মূল দায়িত্বে ছিলেন ডিএমডি ঝুমুর বালা এবং কর্মকর্তা আরমান সিদ্দিকী। কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি শুধুমাত্র ১৬০০ মিটার গায়েব হলেই শেষ হয় না; প্রতিটি মিটারে লক্ষ টাকার অধিক রাজস্ব জড়িত রয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে টাকার বিনিময়ে মিটারগুলো সচল বা অন্যভাবে দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। কিন্তু তারা মূল বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত না করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেন এবং উল্টো অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের প্রমোশনের আওতায় নিয়ে আসেন।

কর্মচারী ইউনিয়ন এই সমস্ত অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণেই তাদের ওপর একের পর এক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও বিভাগীয় মামলা চাপানো হচ্ছে।


পাশাপাশি, ওয়াসার গাড়ির তেলের বিল যেখানে পূর্বে ছিল ২ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা, তা বর্তমানে অবিশ্বাস্যভাবে লাফিয়ে ৫ লক্ষ টাকায় দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, ডিএমডি ঝুমুর বালা নিজেই খুলনা ওয়াসার একাধিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে তাঁর নিজের জেলা গোপালগঞ্জ এবং স্বামীর কর্মস্থল পিরোজপুরে নিয়মিত যাতায়াত করেন। এমডি ও ডিএমডি সিন্ডিকেট এই বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে পকেটস্থ করছেন বলে জানা গেছে।


বদলির আদেশ অমান্য ও কোটি টাকার পদোন্নতি বাণিজ্য: গত ১৪ মে ২০২৫ তারিখে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে কুটির শিল্পে বদলি করা হয় এমডি মো. কামরুজ্জামানকে। কিন্তু বদলির আদেশ হওয়ার পরেও খুলনা ওয়াসার ‘মধু’ ছাড়তে নারাজ তিনি। পদে বহাল থাকতে উচ্চপর্যায়ে জোর লবিং ও তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।


আশ্চর্যের বিষয়, বদলির আদেশ মাথার ওপর থাকা অবস্থাতেই গত ১৮ মে ২০২৬ তারিখে তিনি খুলনা ওয়াসার বেশ কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার পাঁয়তারা চালান। যাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, তাদের নথিপত্রে স্পষ্ট লেখা রয়েছে যে—তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুপারিশ এবং মন্ত্রীদের ডিও লেটারের (DO Letter) মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অযোগ্য ও অদক্ষ হওয়া সত্ত্বেও কেবল রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিপুল ঘুষের বিনিময়ে এই প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে।


রাজস্ব খাতে অবৈধ স্থানান্তর ও নিয়োগ কেলেঙ্কারি: খুলনা ওয়াসার সাবেক এমডি মো. আবদুল্লাহর আমল থেকেই দুর্নীতির এই ধারা চলে আসছে। সরকারি স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে—প্রকল্প শেষ হলে প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিও শেষ হবে, তাদের কোনোভাবেই রাজস্ব খাতে (স্থায়ী পদে) স্থানান্তর করা যাবে না। কিন্তু দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাবেক এমডি তাঁর নিজস্ব সিন্ডিকেটের লোকদের নিয়োগ দেন এবং পরবর্তীতে তাদের স্থায়ী করেন।


এরই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে ২৬টি পদের বিপরীতে প্রায় দুই হাজার চাকরিপ্রার্থী আবেদন করলেও কোনো পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র পছন্দের পকেট প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে ২০২০ সালে একটি মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নং- ৫৯৩৯/২০), যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এই অবৈধ নিয়োগের অন্যতম সুবিধাভোগী খান সেলিম আহমেদ, যার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অসদুপায় ও জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।


ব্যর্থ প্রকল্প ও দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা: অভিযোগ রয়েছে, খুলনা ওয়াসায় ২০-২৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে আরমান সিদ্দিকী ও কামাল উদ্দিন আহমেদের মতো অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প পরিচালনা করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ওয়াসার প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আর এই প্রকল্পের বিশাল দুর্নীতি চিরতরে ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এখন ওইসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পুনরায় প্রমোশন দিয়ে পুরস্কৃত করার ষড়যন্ত্র করছেন বর্তমান এমডি মো. কামরুজ্জামান ও ডিএমডি ঝুমুর বালা।


সাধারণ কর্মচারীদের দাবি: খুলনা ওয়াসার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচারী সিন্ডিকেটের হাত থেকে সংস্থাকে রক্ষা করতে উচ্চপর্যায়ের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। একই সাথে বর্তমান এমডির বদলির আদেশ দ্রুত কার্যকর করে সংস্থায় সুশাসন ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।


কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুজ্জামান এবং ডিএমডি (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।