স্পোর্টস ডেস্ক।।
এশিয়ার সেরা মঞ্চে প্রথমবারের মতো খেলতে এসেছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। তবে সিডনির কমব্যাংক ও পার্থের র্যাকটেঙ্গুলার স্টেডিয়ামে ঐতিহাসিক সেই অভিষেকে কঠিন বাস্তবতা টের পেয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত এএফসি নারী এশিয়ান কাপে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচই হেরে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা। সিডনিতে চীনের সঙ্গে ২-০, উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫-০ গোল ব্যবধানে হারের পর পার্থে নিজেদের শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে আসর শেষ করে দেশে ফিরেছেন আফঈদা-মনিকারা। তবে ফলাফল হতাশাজনক হলেও এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় খেলার অভিজ্ঞতাকে দেশের নারী ফুটবলের জন্য বড় এক অগ্রগতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
১২ দলের এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সবচেয়ে নিচে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১০০-এর বাইরে থাকা একমাত্র দলও ছিল বাংলাদেশ। এমনকি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিংধারী ইরান নারী ফুটবল দলও বাংলাদেশের চেয়ে ৪৪ ধাপ এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আরেক প্রতিনিধি ভারতও র্যাঙ্কিংয়ে ৪৫ ধাপ এগিয়ে। তারাও তিন ম্যাচের তিনটিতে হেরেছে। গোল হজম করে টুর্নামেন্টের সর্বাধিক ১৫টি। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ফলে শক্তির ব্যবধান কতোটা বড় ছিল, সেটি স্পষ্টই বোঝা যায়। গ্রুপের শক্তিশালী দল চীন নারী ফুটবল দল ও উত্তর কোরিয়া নারী ফুটবল দলের কাছে যথাক্রমে ২-০ ও ৫-০ গোলে হারটা অনেকটাই অনুমেয় ছিল। তবে অনেকেই আশা করেছিলেন, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে অন্তত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে বাংলাদেশ।
কারণ গত বছর বাছাইপর্বের উজবেকিস্তানের মতোই র্যাঙ্কিং ৬০-৭০ ধাপ এগিয়ে থাকা মিয়ানমার নারী ফুটবল দলের বিপক্ষে ঠিক জয় পেয়েছিল তারা। পার্থের রেকট্যাঙ্গুলার স্টেডিয়ামে ওই ম্যাচের মতো উজবেকিস্তানকে হারাতে পারলে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সুযোগ তৈরি হতো বাংলাদেশের। সেইসঙ্গে খুলে যেতো আরও বড় দরজা। অলিম্পিক বাছাইপর্ব ও ২০২৭ ফিফা নারী বিশ্বকাপের খেলার সুযোগ পেতে পারতো মেয়েরা। সেটি হয়নি। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের নারী ফুটবল এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে।
অবকাঠামো, ঘরোয়া লীগের কাঠামো, অনুশীলন সুবিধা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। প্রায় প্রতিটি ম্যাচের শেষে সেটাই বারবার বলতে চেষ্টা করেছেন পিটার বাটলার। চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত হবার পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফের) কর্তারা এশিয়ান কাপের প্রস্তুতি নিয়ে অনেক কথাই বলেছিলেন। টিভি ক্যামেরায় সমানে বাগাড়ম্বর করলেও প্রস্তুতির জন্য কার্যকর কিছুই করেননি তারা। মেয়েদের দেশের বাইরে কোথাও ক্যাম্প করানোর একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত ফল অশ্বডিম্ব। অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে তিন মাস কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলানো হয়নি মেয়েদের। ভাবা যায়! লীগের মান বাড়ানোর কোনো চেষ্টা করতেও কর্তাদের দেখা যায়নি।
সারা বছর বাফুফের টার্ফে কিংবা কমলাপুরের টার্ফে অনুশীলন করতে হয়েছে মেয়েদের। থাকতে হয় বাফুফে ডরমেটোরির অস্বাস্থ্যকর অবস্থায়। যেখানে নিউটেশনের বালায় ছিল না। ছিল না ভালো মানের একজন ফিজিও। এমনি দলের সঙ্গেও কোনো ফিজিও আনেনি বাংলাদেশ দল। এখান থেকে নিয়ে দলের চাহিদা পূরণ করেছে তারা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে মেয়েরা যখন সিডনিতে পা রাখেন, তখন তারা মানসিকভাবে বেশ চাপে ছিলেন। সিডনির ভ্যালেন্টাইন স্পোর্টস পার্কে প্রথমে ওঠা, তারপর টিম হোটেল থেকে জুবিলি স্টেডিয়াম পর্যন্ত প্রতিদিন ৪০-৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েও মেয়েরা অনুশীলনে কমতি রাখেননি। তাদের উৎসাহ জোগাতে আসেন এখানকার প্রবাসী বাংলাদেশি সমর্থকরা।
সিডনি-পার্থের ভেন্যুগুলোয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়ছে, জাতীয় সংগীত বেজেছে। সিডনি ও পার্থের স্টেডিয়ামে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে তারা গ্যালারি মুখর করেন। বাংলাদেশের মেয়ের পারফরম্যান্সে তাদের কোনো আফসোস নেই। বাংলাদেশের মেয়েরা এই মঞ্চে খেলেছে, এতেই তারা খুশি। কিন্তু মোটেও খুশি হতে পারেননি বাংলাদেশের কোচ পিটার বাটলার। তার হতাশা কিংবা ক্ষোভ মেয়েদের পারফরম্যান্স নিয়ে নয়। পুরোটায় বাফুফের কর্মকর্তাদের ওপর। তার দাবি বাফুফের অনেকে ফুটবল বোঝে না।
অথচ তারা রেজাল্ট চায়। যারা মেয়েদের একটা ভালো মাঠ দিতে পারে না তারা দেশের ফুটবলের উন্নতি চায় কীভাবে? ‘মাঠই আমাদের বড় প্রতিপক্ষ’ সংবাদ সম্মেলনে বারবার কোচ পিটার বাটলার প্রস্তুতি নিয়ে বাফুফের বালখিল্যতার প্রসঙ্গ টেনেছেন। বিদেশি সাংবাদিকরা সেসব শুনে কী ভেবেছেন কে জানে! তবে পার্থে উজবেকদের কাছে ৪ গোলে উড়ে যাওয়ার পর বাটলার নিজেদের বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে শেষ আক্ষেপটা ঝেড়েছেন এভাবে, ‘আমাদের একটি ভালো মাঠ নেই।’ তারপরই তিনি টেনে আনেন দারুণ এক উদাহরণ, ‘ব্যাপারটা এমন যে একজন বক্সার এক হাত পেছনে বেঁধে লড়াইয়ে নেমেছে।’ কথাটার তাৎপর্য বাফুফের কর্তারা বুঝবেন কিনা, কে জানে! সিডনি বা পার্থের মিডিয়া সেন্টারে বসে বাটলার যে কথাগুলো বলেছেন গত ক’দিনে, তা ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদের কানে পৌঁছাবে কিনা, সেও এক প্রশ্ন।










































