বাগেরহাট প্রতিনিধি।।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাগেরহাটের চারটি আসনের জন্য প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। তবে এই চার আসনের দুটিতে প্রার্থী হয়েছেন এমন নেতা, যারা অতীতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিতে ছিলেন। যদিও এক নেতার দাবি, তিনি কখনও আওয়ামী লীগে ছিলেন না। অপরজন অবশ্য অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান স্বীকার করেছেন।
বাগেরহাট-১ (ফকিরহাট-মোল্লাহাট-চিতলমারী) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্য জোটের সাধারণ সম্পাদক। তিনি জেলার চিতলমারী উপজেলার কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন বলে জানা গেছে। কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব। পাশাপাশি বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কথা অস্বীকার করেছেন।
বাগেরহাট-৪ (শরণখোলা-মোরেলগঞ্জ) আসনে মনোনয়ন পাওয়া সোমনাথ দে মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্য জোটের সভাপতি। তিনি ভিএইচপি বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি। সোমনাথ দে অতীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সংখ্যালঘুবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন দলটির মোরেলগঞ্জ উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও। ২০১৯ সালের শেষের দিকে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০২২ সালে গঠিত দলের উপজেলা কমিটির পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটির ৩ নম্বর সদস্য হন। গত বছরের আগস্টের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, দেশবিরোধী চক্রান্তের অভিযোগে চলতি বছরের ১৫ মার্চ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল। অপর একটি মামলায় কারাভোগ করেছেন সোমনাথ দে। দুজনই জেল থেকে বেরিয়ে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের নিয়ে ২০ আগস্ট বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে দলে যোগ দেন।
শনিবার বিকেলে ঢাকার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে বাগেরহাটের চারটি আসনের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। বাগেরহাট-১ ও বাগেরহাট-৪ আসনের প্রার্থী হিসেবে কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল ও সোমনাথ দের নাম ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
চিতলমারীর বাসিন্দা মোল্লা রাজু আহমেদ লিখেছেন, ‘তথ্যটি জানার পর থেকে নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে, যতটা অসহায় বিগত ফ্যাসিস্ট আমলেও মনে হয়নি। আমাদের এ নির্বাচনী আসনে অনেক প্রবীণ-তরুণ যোগ্য ত্যাগী নেতৃত্ব রয়েছে। যারা শেখ হেলালের বিরুদ্ধে নির্বাচনে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তাদের মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে নমিনি করলে এ আসনের মানুষ বিপুল ভোটে ধানের শীষকে নির্বাচিত করত। কিন্তু আজ এই নমিনেশনের খবরটি শোনার পর থেকে নিজেকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত মনে হচ্ছে।’
মো. শিমুল নামের একজন লিখেছেন, ‘এই সেই আওয়ামী লীগের দালাল, যাকে বাগেরহাট-১ আসন থেকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। এটা মানুষ মেনে নেবে না। সারা বছর রাজপথে থেকে সতেরো বছর ঘুমাতে পারিনি। এখন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।’ কত টাকার বিনিময়ে তিনি (কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল) মনোনয়ন পেয়েছেন– এমন প্রশ্নও ছুড়ে দেন তিনি।
শরণখোলার বাসিন্দা রাসেল আহম্মেদ ফেসবুকে সোমনাথ দের ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘জয় বাংলা, ধানের শীষে ভোট দিন।’ পোস্টের কমেন্টে কেউ লিখেছেন, ‘সাথে জাতীয় পার্টির স্লোগান যুক্ত করে দিন।’ কেউ লিখেছেন, ‘পরবর্তী সিরিয়ালে কোন দল আছে?’ মাসুম শেখ নামের একজন লিখেছেন, ‘বিভিন্ন দলের জল খাওয়া সোমনাথ জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ হয়ে এখন বিএনপির প্রার্থী। আগামীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হলেও বিস্মিত হওয়ার কারণ থাকবে না।’
অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ‘এটিই আমার প্রথম রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মন্দিরের সভাপতি হওয়ায় নির্যাতিত হিন্দুদের অধিকার আদায়ে আমি সব সময় সোচ্চার ছিলাম। এ কারণে এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে আমার কথা বলতে হয়েছে। সেসব ছবি দেখিয়ে এখন ষড়যন্ত্র চলছে। কেউ বলতে পারবে না, কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে আমি বক্তব্য দিয়েছি।’
চিতলমারীর কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিতে তাঁর নাম আছে জানালে ওই কাগজকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ‘পদ নিতে চাইলে অনেক বড় পদ আমি পেতাম; ইউনিয়ন কমিটিতে কেন যাব?’ মামলার বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তিনি বলেন, উচ্চ আদালত থেকে গত সপ্তাহে রুল নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
তবে অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় স্বীকার করেছেন সোমনাথ দে। তিনি বলেন, ‘আমি মনোনয়ন পাওয়ায় যারা চাঁদাবাজ, জুলুমকারী, নির্যাতন করে– তাদের গাত্রদাহ হচ্ছে। কিন্তু যারা সাধারণ মানুষ, তারা আমাকে সাদরে বরণ করেছেন। আমি জাতীয় পার্টি করেছি, আওয়ামী লীগ করেছি। ৫ আগস্টের পর জেল খেটেছি। আমার নামে এখনও তিনটি মামলা রয়েছে। এসব জেনেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহোদয়, দলের হাইকমান্ড আমাকে মনোনীত করেছেন।’
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ সালাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এটি কীভাবে মেনে নেবে বলেন?’ দীর্ঘদিন তিনি রাজপথে ছিলেন জানিয়ে বাগেরহাট-২ আসনের মনোনয়নও পুনর্বিবেচনার দাবি জানান এম এ সালাম। তাঁর পক্ষে রোববার সন্ধ্যায় একটি মশাল মিছিল হয়েছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ টি এম আকরাম হোসেন তালিম বলেন, ‘কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে আমাদের আসলে করার কিছু নেই। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’











































