Home আলোচিত সংবাদ নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা

নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা

31


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

বাঙালির প্রাণের উৎসবের দিন হলো পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ। আর এ পহেলা বৈশাখের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হালখাতার নাম। যদিও ডিজিটাল এই যুগে হালখাতা প্রথার প্রচলন কমে গেছে অনেকটাই, বিশেষ করে শহরে।

হালখাতা শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা লাল মলাটের মোটা খাতা। হালখাতা একটা ঐতিহ্য। হালখাতা একটা রেওয়াজ। হালখাতা একটা উৎসব। হালখাতা একটা ইতিহাস। সওদাগররা বৈশাখী আমেজ খুঁজেন হালখাতাতেই। খদ্দেররাও মিষ্টিমুখ করতে সকাল সকাল ভীড় জমান বাকি-দোকানে।

অতীতের দিনগুলোতে হালখাতা উপলক্ষে রীতিমতো নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে উত্‍সবের আয়োজন করতেন দোকানিরা। এখন বিভিন্ন অ্যাপ ও অনলাইন শপিংয়ের কারণে হালখাতার সেই জৌলুস কমে এসেছে। কম্পিউটারেই ব্যবসার হিসেব রাখেন বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা। তাই খাতার ব্যবহারও কমে গেছে অনেকটাই। তবে গ্রামেগঞ্জে এখনও ঐতিহ্য মেনে অনেক ব্যবসায়ীই হালখাতার আয়োজন করেন বছরের প্রথম দিন।

অতীতে জমিদারকে খাজনা প্রদানের অনুষ্ঠান হিসেবে ‘পূণ্যাহ’ প্রচলিত ছিলো। বছরের প্রথম দিন প্রজারা সাধ্যমতো ভালো পোশাকআশাক পরে জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করতেন। তাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ায় ‘পূণ্যাহ’ বিলুপ্ত হয়েছে। তবে রয়ে গেছে হালখাতা। মোঘল সম্রাট আকবরের আমল থেকে পয়লা বৈশাখের উদযাপনের প্রথা শুরু হয়। সেই সময় থেকেই দোকানে দোকানে ব্যবসার হিসাব করার জন্য শুরু হয় হালখাতার প্রথা। হাল মানে নতুন, হালখাতা অর্থাত্‍ নতুন খাতা। পুরনো বছরের সব হিসাব মিটিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় নতুন খাতায় হিসাব-নিকেশ করা। এই খাতা তৈরি করা হয় লম্বা সাদা কাগজ বাঁধাই করে আর লাল সালু কাপড়ের মলাটে মুড়িয়ে। হিসাবের এই খাতার প্রতি পাতায় ৪টি করে সমান ভাঁজ থাকে। বাম পাশে জমা ও ডান পাশে খরচের হিসাব। লালখাতাকে টালিখাতা নামেও ডাকা হয়।

বাংলা সনের প্রথম দিন দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার এ প্রক্রিয়া পালন করা হয়। ব্যবসায়ীরা এদিন তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এজন্য ক্রেতাদের আগের বছরের সব পাওনা পরিশোধ করার কথা বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে নববর্ষের দিন তাদের মিষ্টিমুখ করান ব্যবসায়ীরা।

বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা

আগে একটি মাত্র মোটা খাতায় দোকানিরা তাদের যাবতীয় হিসাব লিখে রাখতেন। এই খাতাটি বৈশাখের প্রথম দিন নতুন করে হালনাগাদ করা হতো। হিসাবের খাতা হালনাগাদ করার এ রীতি থেকেই উদ্ভব হয় হালখাতার। একসময় বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এ উপলক্ষে দোকানে দোকানে মিষ্টি বিতরণ করা হতো। পাশাপাশি থাকতো সুগন্ধি পানের আয়োজন। অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে মিষ্টান্ন পাঠাতেন। যদিও এখন কেবল স্বর্ণালঙ্কারের দোকানেই এ প্রথা পালিত হতে দেখা যায় বেশি। বিশেষ করে ঢাকার আদি ব্যবসায়ী পরিবারে মহাসমারোহে পালিত হয় এ রীতি।

সারাদেশে পহেলা বৈশাখে হালখাতা খুললেও রীতি অনুযায়ী পুরান ঢাকার লক্ষীবাজার, শ্যামবাজার, বাবুবাজার, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, ইসলামপুর, চকবাজারের দোকানগুলোতে হালখাতার আয়োজন করা হয় তার পরদিন। তবে তাদের প্রস্তুতি থাকে পুরো মাসজুড়ে। ধোয়া-মোছা ও হিসাব-নিকাশের কাজ। আবার কেউ নতুন বছর উপলক্ষে পুরো দোকানেই নতুনত্ব আনার জন্য পুরোনো জিনিসপত্র রং করার কাজে ব্যস্ত থাকেন। দোকানগুলো সাজানো হয় বৈশাখ উদযাপনের নানা উপকরণ দিয়ে। মুখোশ, ঘুড়ি, বৈশাখী টুপি, একতারা, ডুগডুগি দিয়ে দোকান সাজান ব্যবসায়ীরা।

ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চার প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা কেন্দ্র’ এর পরিচালক পুরান ঢাকা বিশেষজ্ঞ আজিম বখ্শ ষাট-সত্তর দশকের হালখাতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘শুরু থেকেই এটা ব্যবসায়ীদের উৎসব। সেসময়ে পুরান ঢাকায় হিন্দু ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশ আড়ম্বরে হালখাতা করার প্রবণতা ছিল। সেটি ছিল লাল সালু কাপড়ের মলাটে মোড়ানো লাল রঙের একটি খাতা। আমি দেখেছি, হিন্দু ব্যবসায়ীরা পুরোনো খাতা বাদ দিয়ে পয়লা বৈশাখে হালখাতা শুরুর আগে নতুন খাতাটি নিয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে যেতেন। পূজা দিতেন। পূজারিরা সিঁদুরের মধ্যে কাঁচা পয়সা ডুবিয়ে ওসই পয়সা সিলমোহরের মতো ব্যবহার করে নতুন খাতায় ছাপ মেরে তা উদ্বোধন করতেন। যখন থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীদের আধিক্য বাড়ে, সে সঙ্গে এই উৎসব ফিকে হওয়া শুরু করে।’

দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে সালু-খাতা তৈরি করেন পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার লোকনাথ বুক এজেন্সি। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সাইদুজ্জামান জানান, আগে হালখাতার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এখন তেমন চাহিদা নেই। হালখাতা বিক্রি হয় যৎসামান্য। মূলত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে মানুষ আস্তে আস্তে হালখাতা ব্যবহার থেকে সরে আসছে। দিন যত যাচ্ছে হালখাতার ভবিষ্যত ততই অন্ধকার বলে তিনি মনে করেন।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী দীপন নন্দি বলেন, মানুষের হাতে এখন কাড়ি কাড়ি টাকা। আগের মতো বাকি করতে হয় না। শহরেও কেন, গ্রামেও এ জিনিসটা লক্ষণীয়। এ কারণেও হালখাতা রেওয়াজটা কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত’।