কয়রা প্রতিনিধি।।
বাড়ির পাশে শাকবাড়িয়া নদী থেকে হাঁড়িভর্তি নোনা পানি নিয়ে ফিরছিলেন সুফিয়া খাতুন। এ পানি কী কাজে লাগবে– জানতে চাইলে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘পানি তো সব কাজেই লাগে। ঘর-গেরস্তালির কাজে লাগে, রান্না-বান্নার কাজে লাগে, গা ধোবার (গোসল) জন্যিও লাগে। এ গাঙের (নদী) পানি আছে বলেই সেটুকু সারতি পারছি। বাড়ির পুকুরির পানির যে অবস্থা, হাত ধোবারও জো নেই।’
সুফিয়ার কাছ থেকে জানা গেল, এলাকায় চিংড়ি চাষের কারণে সর্বত্র লোনা পানি ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়ির পুকুর ও ডোবার বদ্ধ পানিতে নামলে শরীরে দেখা দেয় নানা উপসর্গ। বাধ্য হয়ে নদীর পানি ব্যবহার করছেন তারা। খাবার পানি টাকা দিয়ে কিনতে হয়। প্রতি ড্রামের দাম ৬০ টাকা। এমন অবস্থা খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন মহেশ্বরীপুর, শেখেরকোণা, তেঁতুলতলার চর ও নয়ানিসহ নদী তীরবর্তী বেশির ভাগ গ্রামে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও লবণাক্ত থাকায় এলাকার বেশির ভাগ গভীর ও অগভীর নলকূপ অকেজো পড়ে আছে। এক দশক আগে এসব গ্রামের মানুষ স্থানীয় সরকারি-বেসরকারি পুকুরের পানি ব্যবহার করতে পারলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। লোনা পানির চিংড়িঘের সবকিছু বদলে দিয়েছে। লবণাক্ততার কারণে পুকুরের পানি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। ক্ষতি হচ্ছে চাষাবাদেও। মানুষের ত্বকের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
দীর্ঘদিন নোনাপানির সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের নানা রোগ দেখা দেয় জানিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ফাঙ্গাস বা ছত্রাকজনিত নানা সংক্রমণ বেশি দেখা দিতে পারে। এতে ত্বকের উপরিভাগের চামড়া মরে যায়। আবার খোস-পাঁচড়াও দেখা দিতে পারে।
মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলার ৪০ হাজার বিঘা জমির ঘেরে নোনাপানির চিংড়ি চাষ হয়েছে। সাতটি ইউনিয়নে ১৩১টি গ্রাম রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭২টিতে নোনাপানির চিংড়ি চাষ হয়। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় গোটা কয়রা নোনাপানিতে তলিয়ে যায়। তখন থেকে নোনাপানির চিংড়ি চাষ বেড়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১০টি সরকারি পুকুর রয়েছে। সেগুলোর পাড় উঁচু করেও লবণাক্ততা কমানো যায়নি। এ ছাড়া ব্যক্তিগত পুকুরেও লবণাক্ততার কারণে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী। নোনাপানির চিংড়ি চাষের কারণে এলাকার মাটিও লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে।
এবার ১৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ হয়েছিল বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, অনেক স্থানে লোনা পানির ঘেরের কারণে ফলন ভালো হয়নি। তবে বেশির ভাগ এলাকায় লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ করায় ফলন ভালো হয়েছে। নোনাপানির চিংড়ি চাষ বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা।
গত বুধবার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শেখেরকোণা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মানুষ নদীর লবণাক্ত পানিতে গোসল সারছেন। অপর পাড়ের সুন্দরবনের গাছগাছালির আবর্জনা ভেসে বেড়াচ্ছে নদীতে। নেট দিয়ে সেসব ছেঁকে ফেলে দিয়ে পানি কলসিতে ভরে বাড়িতে নিচ্ছেন অনেকে। এ পানি দিয়ে সেরে নেওয়া হয় গৃহস্থালির কাজ।
বর্ষাকালে নদীর পানির লবণাক্ততা কিছুটা কমে বলে জানান গ্রামের হারুন সরদার। তাঁর ভাষ্য, শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। তখন পানি মুখেও দেওয়া যায় না। একই গ্রামের কলেজপড়ুয়া এক তরুণী বলছিলেন, ‘নোনাপানির কারণে গায়ের রং কালো হয়ে যায়। বাতাসেও নোনা ভাইসে বেড়ায়।’
তরুণীর কথায় সুর মিলিয়ে পাশে দাঁড়ানো এক নারী বলেন, ‘গায়ের রং চাপা (কালো) হওয়ায় মাইয়ে বিয়ে দিতি কষ্ট হয়। দূরের আত্মীয়স্বজন আসতি চায় না। একেনে আসলি গোসল করতি পারে না। খাবার পানিও মাইপে খাতি হয়।’
এলাকার সব পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে গেছে জানিয়ে ইউপি সদস্য আব্দুল গনি বলেন, নলকূপ বসিয়েও লাভ না হওয়ায় ট্যাঙ্কিতে অনেকে বর্ষাকালে পানি জমিয়ে রাখেন। সে পানিতে একটি পরিবারের দু’তিন মাস চলে। তবে সবার ট্যাঙ্কি নেই। সুপেয় পানির সমস্যা দূর করতে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁর।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, নোনাপানির ঘেরের কারণে পুকুরের পানি পানযোগ্য নেই। বর্ষাকালে পানি জমিয়ে রাখতে অনেক পরিবারকে ট্যাঙ্কি দেওয়া হয়েছে। তবে তাতে সারাবছর চলে না। এ জন্য এলাকার মিঠা পানির পুকুর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।











































