Home জাতীয় হৃদরোগে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যু

হৃদরোগে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যু

397

 

ঢাকা অফিস।।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ও জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (১৪ আগস্ট) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর রোববার তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সোমবার তার আরেকটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়।

ঢাকার বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল রেজাউর রহমান বলেন, ‘রাত ৮টা ৪০ মিনিটে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে (হার্ট অ্যাটাক) হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় তার আরেকটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল।’

তিনি জানান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বহুদিন ধরে হৃদরোগের জটিলতায় ভুগছিলেন। এর আগে তার হৃদপিণ্ডে পাঁচটি টেন্ট পড়ানো হয়েছিল।

মানবতা-বিরোধী অপরাধের অভিযোগে আমৃত্যু কারাগারে থাকার সাজা হয়েছিল দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীর।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তার বিরুদ্ধে মোট ২০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল ১৯৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, হত্যায় সহযোগিতা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ এবং ধর্মান্তরে বাধ্য করা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর তিনি আধা মিলিশিয়া রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে পাকিস্তানী বাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন।

যে ২০টি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, তার মধ্যে আটটি অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এর মধ্যে দুটি অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আপিল বিভাগ দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।

বক্তা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা
বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পরিচিতি পান মূলত আশির দশকের শুরু থেকে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তখন তিনি ‘ওয়াজ মাহফিল’ নামে পরিচিত ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে একজন বক্তা হিসেবে হাজির হতে শুরু করেন।

পিরোজপুরের জিয়ানগরের সাঈদখালিতে ১৯৪০ সালে জন্ম নেন জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

সাঈদখালির মানুষের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে, জন্মের পর তিনি এলাকায় পরিচিত ছিলেন দেলোয়ার শিকদার নামে।

বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের যে ওয়ার্ডটির অধীনে সাঈদখালি গ্রাম, ওই ওয়ার্ডের একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হারুনুর রশীদ। মোবাইল ফোনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য তিনি নিশ্চিত করেছেন তিনি।

তিনি বলেছেন, ‘ওনাকে সবাই দেলোয়ার শিকদার নামে চিনত। স্বাধীনতার সময় তো আমার বয়স খুব কম ছিল। এ বিষয়ে আমি বলতে পারব না। তবে আমি শুনছি এইটা। ওনার বংশ শিকদার বংশ। ওনার নাম কিভাবে সাঈদী হলো সেটা বলতে পারব না। হয়ত সাউদখালি নাম থেকেই উনি নিজের নাম করেছেন সাঈদী।’

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পরিবারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, শিকদার কখনো তাদের পারিবারিক উপাধি ছিল না। তার ছেলে মাসুদ সাঈদী বলেন, সাঈদী তাদের পারিবারিক উপাধি।

স্থানীয় সাংবাদিক নাসিরউদ্দীন বলছেন, সাউদখালি গ্রামকে এখন সাঈদখালি বলা হচ্ছে, সাঈদীর নামের সাথে মিলিয়ে।

বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বলছেন, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বাবা ছিলেন গ্রামের খুব সাধারণ এক গৃহস্থ।

পরিবারের কাছে থেকে পাওয়া জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পড়াশোনা করেছেন গ্রামের মক্তবে, এরপর শর্ষিনার পীর পরিচালিত আলিয়া মাদরাসা, বারুইপাড়া সিদ্দিকিয়া মাদরাসা এবং খুলনা আলিয়া মাদরাসা।

স্থানীয় সাংবাদিক নাসিরউদ্দীন জানাচ্ছেন, পড়াশোনা শেষে তিনি গ্রামের কাছে এক বাজারে কিছু দিন ব্যবসা করেছেন বলেই তারা জানেন।

তিনি জানান, ‘উনি মূলত এর আগে পারেরহাটে ব্যবসা করতেন ভায়রা ভাইয়ের সাথে মিলে। মুদি দোকানের ব্যবসা ছিল। তখন কিন্তু তিনি এত নামকরা লোক ছিলেন না। সাধাসিদে জীবন-যাপন করতেন। কিন্তু আশির দশকে উনি ওয়াজ নসিহত করা শুরু করেন। পরে আস্তে আস্তে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। এখান থেকেই উনার নাম ছড়িয়ে পড়ে।’

তবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাইদী জানিয়েছেন, এই তথ্য সঠিক নয়, তিনি পারের হাটে কখনো ব্যবসা করেননি, ব্যবসা করেছেন খুলনায়।

তিনি বলেন, ‘বেসিক্যালি তিনি একজন লেখক। ছাত্র-জীবনের পর থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তিনি ব্যবসা মূলত শুরু করেন স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে যখন খুলনা-যশোরে বসবাস করতেন তখন। এরপর তিনি লেখালেখি করেছেন স্বাধীনতার পরে। আর কোরআনের দাওয়াত দেয়াটা ছিল তার মিশন।’

আশির দশকের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একজন সুবক্তা হিসেবে খুব দ্রুত পরিচিতি অর্জন করেন। তার ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে জনসমাগমও বাড়তে থাকে।

সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
দেলাওয়ার হোসোই সাঈদীর জীবনের যে অধ্যায়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক, সেটি মূলত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং তার পরের কয়েক বছর।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তার বিরুদ্ধে মোট ২০টি অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, হত্যায় সহযোগিতা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ এবং ধর্মান্তরে বাধ্য করা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর তিনি আধা মিলিশিয়া রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে পাকিস্তানী বাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন।

তবে তার ছেলে মাসুদ সাঈদীর ভাষ্য ভিন্ন। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালে দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদী পিরোজপুরেই ছিলেন না।

তিনি বলেন, ‘১৯৬৯ সাল হতে তিনি যশোরের নিউমার্কেট এলাকায় এ ব্লকের একটি বাড়িতে বসবাস করতেন। ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একজন সুবক্তা হিসেবে খুব দ্রুত পরিচিতি অর্জন করেন। তার ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে জনসমাগমও বাড়তে থাকে।’

কিন্তু একই সাথে তিনি বাংলাদেশের মানুষের একটি বিরাট অংশের কাছে বিতর্কিত হয়ে পড়েন তার নানা রাজনৈতিক মন্তব্য এবং জামায়াতে ইসলামীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর।

ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছদ্মাবরণে জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠনের পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করছেন বলে অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।

শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে দৃশ্যমান না থাকলেও তিনি যে এই রাজনীতির সক্রিয় সমর্থক সেটি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কখনো গোপন করেননি।

এরপর অবশ্য তিনি প্রকাশ্যেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পর পর দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের অন্য নেতাদের সাথে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তিনি ২০০৯ সালে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলায় তিনি গ্রেফতার হন তিনি। পরের বছর অর্থাৎ ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

এরপর থেকেই তিনি কারাগারে ছিলেন।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। তবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আপিল বিভাগ দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।