নড়াইল প্রতিনিধি ।।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছনার ঘটনায় ৩১ দিন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর বুধবার থেকে খুলছে নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ। তবে প্রথমদিনে শুধুমাত্র দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান হবে বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
এদিকে লাঞ্ছনার শিকার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস কলেজে ফিরছেন না বলে তার পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, কলেজে প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থী রয়েছেন। এইচএসসি পরীক্ষর ফরম পূরণ চলাকালে গত ১৮ জুন ফেসবুকে ধর্ম অবমানার এক ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়। এরপর কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ ৯০ জন এইচএসসি পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছেন। কলেজ খোলার পর প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষার তারিখ দেওয়া হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানান।
জিবির সভাপতি অচীন চক্রবর্তী বলেন, কলেজের পরিচালনা পর্ষদের এক জরুরি সভায় দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজ খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক বুধবার কলেজ খোলা হবে।
তিনি আরও বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস যোগদান করবেন কি-না তা এখনো তিনি জানাননি।
জিবির অন্যতম সদস্য ও বিছালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান বলেন, বুধবার কলেজ খুলবে এবং দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরু হবে। কয়েক দিনের মধ্যে বাকিদেরও পাঠদান শুরু করা হবে। তবে অধ্যক্ষ ছুটিতে থাকায় প্রথমদিন তিনি কলেজে উপস্থিত থাকবেন না। যখন তিনি ক্লাসে ফিরবেন তখন আমরা এলাকাবাসী, শিক্ষক-কর্মচারীরা ও শিক্ষার্থীরা তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিতে প্রস্তুত থাকব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষের মাতা বনলতা বিশ্বাস বলেন, স্বপন (অধ্যক্ষ) কলেজে যাবে কি-না, সেটা আমরা বলতে পারি না। কারণ ঘটনার পর থেকে আমাদের সঙ্গে তার কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। যেখানে আমার সন্তান নিরাপত্তার অভাবে বাড়ি ফিরতে পারছে না। এমনকি তার তিনকন্যা সন্তানসহ আমরা পরিবারের কেউই নিরাপত্তার অভাবে বাইরে বের হতে পারি না। সেখানে সে (অধ্যক্ষ) কিভাবে কলেজে যোগদান করবে। তবে আমার ছেলেকে যেভাবে জনসম্মুখে জুতার মালা পরিয়ে অপমান, অপদস্ত করেছে- ঠিক সেইভাবে যদি জনসম্মুখে ফুলের মালা পরিয়ে তাকে বরণ করে নেয়, তবে সে কলেজে যোগদান করবে। এটাই আমার চাওয়া।
এ প্রসঙ্গে নড়াইল সদর থানার ওসির চলতি দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদুর রহমান বলেন, কলেজ খোলার বিষয়টি আমি শুনেছি। যদি বুধবার কলেজ খোলে তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ জুন অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। ওই দিন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় ওরফে বাপ্পী রায় নিজের ফেসবুক আইডিতে বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে পোস্ট করেন, ‘প্রণাম নিও বস ‘নূপুর শর্মা’ জয় শ্রীরাম’। বিষয়টি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে কলেজের কিছু ছাত্র তাকে সেটি মুছে (ডিলিট) ফেলতে বলেন।
এরপর ১৮ জুন সকালে অভিযুক্ত ছাত্র কলেজে আসলে তার সহপাঠীসহ সব মুসলিম ছাত্র তার গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের দাবি তুলে অধ্যক্ষের নিকট বিচার দেয়। কিন্তু ওই সময় ‘অধ্যক্ষ একই সম্প্রদায়ের লোক হওয়ায় তাকে রক্ষা করার চেষ্টায় ওই ছাত্রের পক্ষ নিয়েছেন- এমন কথা রটানো হলে উত্তেজনা তৈরি হয়।
এ সময় বিষয়টি কলেজের গণ্ডি ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা অভিযুক্ত ছাত্রের সঙ্গে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও ক্ষোভে-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। একপর্যায় পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার মধ্যে দফায় দফায় তুমুল সংঘর্ষে দুই পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ওই সময় বিক্ষুব্ধ জনতা কলেজের অধ্যক্ষসহ হিন্দু শিক্ষকদের ৩টি মোটরসাইকেল আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
এরপর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তাদের উপস্থিতিতেই উত্তেজিত জনতা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায়ও জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করেছিল।











































