বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
দ্বিতীয় ঢেউয়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও। গত ১৫ দিনেই ১ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। শনিবার করোনায় আরও ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এর অর্ধেকের বেশি রোগী ঢাকা বিভাগে মারা গেছে। নতুন করে ৪ হাজার ৩৩৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৩৮ জন। শনাক্ত রোগীর অর্ধেকের বেশি ঢাকা বিভাগের। শুরু থেকেই ঢাকায় করোনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। দেশব্যাপী লকডাউনেও করোনা পরিস্থিতির উন্নতিতে তেমন প্রভাব পড়েনি। সারা দেশে ডেল্টা (ভারতীয়) ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে। শুরুতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এই ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বেশি ছিল। দেশের মধ্যাঞ্চল অর্থাৎ ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসটি। গতকাল সারা দেশে সংক্রমণের হার ছিল সাড়ে ২২ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদ- অনুযায়ী, টানা দুসপ্তাহের বেশি সময় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়। সেখানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে শনাক্তের হার ২০ শতাংশের ওপরে। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে দ্বিতীয় ঢেউয়ে করোনার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দেশে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরু হয় গত মার্চের শেষদিকে। এপ্রিলে পরিস্থিতি নাজুক হওয়ার পর ১০ দিনেই ১ হাজার রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। সীমান্ত জেলাগুলোতে ভারতীয় (ডেল্টা) ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সোমবার থেকে কঠোর বিধিনিষেধে করোনা সামাল দেওয়ার পদক্ষেপে যাচ্ছে সরকার।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭৭০ জন করোনা রোগী এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে। এরপরই চট্টগ্রাম বিভাগে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৪৮, রাজশাহী বিভাগে ৫১ হাজার ৬২০, খুলনা বিভাগে ৫০ হাজার ৭৯৭, সিলেটে ২৪ হাজার ৪৪৩, বরিশাল বিভাগে ১৬ হাজার ৯০৯, ময়মনসিংহ বিভাগে ১২ হাজার ৬৫৫ জন।
গত কয়েকদিন ধরেই করোনার সংক্রমণে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ২৪ জুন দেশে এক দিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আবারও ৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২৫ জুন শনাক্ত রোগী ৫ হাজার ৮৬৯, বুধবার ৫ হাজার ৭২৭, ২২ জুন ৪ হাজার ৮৪৬, ২১ জুন ৪ হাজার ৬৩৬ ও ২০ জুন ৩ হাজার ৬৪১ জন করোনা রোগী শনাক্তের খবর জানানো হয়।
গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে গত ৭ এপ্রিল রেকর্ড ৭ হাজার ৬২৬ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়। ২৪ জুন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৫৮ জন রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম এই ভাইরাসে মৃত্যু হয়। এ বছর ১১ জুন মৃতের সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ১৯ এপ্রিল রেকর্ড ১১২ জনের মৃত্যু হয়। ২৫ জুন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ১০৮ জনের। দেশে এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুতেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগে ৭ হাজার ৪৮৯ জন করোনা রোগীর এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে। এরপরই মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ২ হাজার ৬৭০, খুলনা বিভাগে ১ হাজার ১৩৩, রাজশাহী বিভাগে ৯৬১, রংপুর বিভাগে ৫৬৯, সিলেটে ২১৮, বরিশাল বিভাগে ৪১৪ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ২৯৯ জন।
প্রথম মৃত্যুর আড়াই মাস পর গত বছরের ১০ জুন মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়ায়। এরপর ৫ জুলাই ২ হাজার, ২৮ জুলাই ৩ হাজার, ২৫ আগস্ট ৪ হাজার, ২২ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ছাড়ায় মৃতের সংখ্যা। এরপর কমে আসে দৈনিক মৃত্যু। ৪ নভেম্বর ৬ হাজার, ১২ ডিসেম্বর ৭ হাজারের ঘর ছাড়ায় মৃত্যুর সংখ্যা। এ বছরের ২৩ জানুয়ারি ৮ হাজার এবং ৩১ মার্চ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়ায়। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর ১৫ দিনেই ১ হাজার কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যু ঘটলে গত ১৫ এপ্রিল মৃতের মোট সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর পরের ১ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটাতে মাত্র ১০ দিন সময় নেয় করোনাভাইরাস; মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়ে যায় ২৫ এপ্রিল। তার ১৬ দিন পর ১১ মে করোনাভাইরাসে মৃত্যু ১২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তার এক মাস পর ১১ জুন তা ১৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এক দিনে মৃত্যুর রেকর্ডও হয়েছে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে। ১৯ এপ্রিল ১১২ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। সে সময় টানা চার দিন মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১০০’র ওপরে।
করোনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে সারা দেশে কমপক্ষে ১৪ দিনের জন্য শাটডাউনের সুপারিশ করেছিল কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা জানান, এই সময়ে জরুরি সেবা ছাড়া যানবাহন ও অফিস-আদালতসহ সবকিছু বন্ধ রাখার সুপারিশ তারা করেছেন। এ ব্যবস্থা কঠোরভাবে পালন করতে না পারলে যত প্রস্তুতিই থাকুক না কেন স্বাস্থ্যব্যবস্থা অপ্রতুল হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় কিছু বাদ দিয়ে কিছু আরোপ করে সফলতা পাওয়া যাবে না। যেসব দেশ করোনা সংক্রমণ কমিয়ে নিয়ে এসেছে তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারকে শাটডাউনের পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, করোনা সংক্রমণ কমাতে জনগণের অংশগ্রহণ লাগবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে মানুষ সচেতন না হলে কোনোভাবেই দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এই পরিসংখ্যান করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে একটি ধারণা দিচ্ছে। তিনি সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন।










































