বিশেষ প্রতিনিধি
অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায়নি। সেই সকাল থেকেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন যুবাদের এক পলক দেখতে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের চতুর্দিকে মানুষের ঢল নামে। বিকেল পৌনে পাঁচটায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখার পর ফুলেল শুভেচ্ছা শেষে অবশেষে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লেখা বাসে করে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় স্টেডিয়ামে আসেন যুব ক্রিকেটাররা। বীরবেশে আগমন ঘটে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। স্টেডিয়ামের সামনে ঢল ঠেলে যুবারা বিসিবি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাষে ত্রিশ গজের মধ্যে লাল গালিচায় বরণ করে নেয়া হয় যুব ক্রিকেটারদের। সংবর্ধনা দেয়া হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। কেক কেটে সংবর্ধনা দেয়া হয়। উনিশবার ফায়ার ওয়ার্কস করা হয়। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর যে ছবি তোলা হয়, সেই ছবি কেকে থাকে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় যুব বিশ্বকাপ শেষ হয় ৯ ফেব্রুয়ারি। এই তারিখটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ঐতিহাসিক হয়ে গেছে। তারিখটিতে যে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস মিলেছে। প্রথমবারের মতো যুব ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসিয়েছেন দেশবাসীকে। বাঁধভাঙ্গা উল্লাস হয়েছে। তবে বুধবার যখন দল দেশে ফিরে আসে তখন উৎসব হয়। বিমানবন্দরে ক্রিকেটারদের ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে অভ্যর্থনা দেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। বিমানবন্দরেও মানুষের ঢল নামে। তবে বিমানবন্দরে নিরাপত্তার স্বার্থেই বিশেষ আয়োজন রাখা হয়নি। যে পরিমাণ মানুষ ছিলেন তাতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে নিরাপত্তা কর্মীরাই হিমশিম খান। যুব ক্রিকেটারদের তাই দ্রুতই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লেখা বাসে করে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আনা হয়। স্টেডিয়ামেও প্রচুর মানুষ থাকে। স্টেডিয়ামজুড়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে থাকে। চ্যাম্পিয়নদের দেখতে অনেকদূর থেকেও ক্রিকেট সমর্থকরা আসেন। ঢোল বাজিয়ে উল্লাসে ফাটেন ক্রিকেট সমর্থকরা। স্টেডিয়ামের বাইরে যে ভিড় ছিল তা ঠেলে অনেক কষ্টে ক্রিকেটারদের বাস স্টেডিয়ামের মূল গেটে আসে। এরপর ক্রিকেটাররা এক এক করে বিসিবি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এক ঘণ্টা বিশ্রাম শেষে ‘হোম অব ক্রিকেটে’ ঢুকেন ক্রিকেটাররা। বিসিবি সভাপতি ক্রিকেটারদের নিয়ে লালগালিচায় প্রবেশ করেন। বিসিবি সভাপতি, গেম ডেভলপমেন্ট চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ সুজন, প্রধান কোচ নাভিদ নেওয়াজ ও অধিনায়ক আকবর আলীর হাতে বিশ্বকাপ শিরোপা শোভা পায়। বিসিবি সভাপতি ও আকবর একসঙ্গে বিশ্বকাপ হাতে ফটোসেশন করেন। বিসিবি সভাপতির হাতে শিরোপা তুলে দেন অধিনায়ক আকবর। ক্রিকেটাররা, কোচিং স্টাফের সবাই সঙ্গে থাকেন। পেছনে থাকে বাংলাদেশের পতাকা। বিসিবি সভাপতি ও আকবর কেক কাটেন। আতশবাজি হয়। ক্রিকেটারদের কেক খাওয়ান বিসিবি সভাপতি। ১৯ বার ফায়ার ওয়ার্কস হয়। আতশবাজির আলোকিত মিরপুরের আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে। কেক কেটে সংবর্ধনা দিয়েছে যেহেতু অনুর্ধ-১৯ দলের ক্রিকেটাররা চ্যাম্পিয়ন হন। শেষ হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। ফায়ার ওয়ার্কস শেষে যুব ক্রিকেটারদের বাড়িতে, পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে বিসিবি।

পুরো স্টেডিয়াম আলোকিত হয়ে ওঠে। চতুর্দিকে আলোকসজ্জা করা হয়। যে সমর্থকরা স্টেডিয়ামে আসেন, কান্তিহীনভাবে তারা উল্লাস করতে থাকেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও সমর্থকরা মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দেখতে ছুটে আসেন। ভারত যুব দলকে বৃষ্টি আইনে ৩ উইকেটে ফাইনালে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেন আকবরা। জয়ের পর অধিনায়ক আকবর আলী বলেছিলেন, ‘মাঠে খেলে ১১ ক্রিকেটার। তবে অনেকেই অনুপ্রেরণা দিয়ে যান। বিশেষ করে দর্শকরা। তারা বিশেষ ভূমিকা রাখেন।’ সেই দর্শকরা, সমর্থকরা শুধু খেলার সময় মাঠে থেকেই নয়, বুধবার মাঠের বাইরে থেকেও দলকে সমর্থন দিয়ে যান। ব্যান্ড পার্টিতে ছেয়ে যায় স্টেডিয়াম অঙ্গন। নাচে-গানে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি গাইতে থাকেন সমর্থকরা। ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ। ক্রিকেটপ্রেমীদের তাই মাঠে ঢোকার ব্যবস্থাও করে দেয়া হয়। সবাই মাঠে প্রবেশ করে। দলকে দেয়া সংবর্ধনার সঙ্গে যেন ক্রিকেটপ্রেমীরাও যুক্ত থাকতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা হয়। গ্রাউন্ডসম্যানরা চ্যাম্পিয়নযুক্ত জার্সি পরে মাঠে থাকেন। বোর্ডের কর্মকর্তারাও চ্যাম্পিয়নযুক্ত জার্সি পরে উপস্থিত থাকেন।
বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা খুব বড় নয়, তবে ভালভাবেই সংবর্ধনার ব্যবস্থা করেছি। যেহেতু ১৯ দল, তাই ১৯ বার ফায়ার ওয়ার্কস হবে। এর আগে কেক কেটে সংবর্ধনার শুরু হবে। সংবর্ধনা শেষে ক্রিকেটারদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’
বিসিবির পরিচালক ইসমাইল হায়দার মল্লিক বলেন, ‘অপেক্ষা অনেকদিনের। এ ছেলেদের শেষ দুই বছর আমরা বিদেশী কোচ, ট্রেইনার নেয়া হয়েছে। আমাদের সর্বোচ্চ বাজেট গেম ডেভলপমেন্টে। এখানে অনুর্ধ-১৯, ১৭, বয়সভিত্তিক দল চলে। গেম ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ সুজন, কোচিং স্টাফ, বিশেষ করে ক্রিকেটারদের ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ভাল করার তাগিদ সবসময়ই থেকেছে। আমরা চাই এখন সিনিয়র ক্রিকেটাররাও বিশ্বকাপ জিতুক। আমরা অনুর্ধ-২১ দলকে গঠন করা হবে। বিদেশী কোচ, ট্রেইনার দিয়ে, স্কলারশিপের আওতায় দলটি থাকবে।’
বিসিবির পরিচালক এবং মিডিয়া চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস বলেন, ‘যে কোন দিক থেকেই এটা বড় সাফল্য। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কি উল্লাস। এমন এর আগে কখনই দেখা যায়নি। আমরা এখন বলতে পারি, আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’ বিসিবির পরিচালকরা, কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। সাবেক অধিনায়ক ও পরিচালক আকরাম খান, নাঈমুর রহমান দুর্জয়রাও যুব ক্রিকেটারদের সংবর্ধনায় উপস্থিত থাকেন।
সাবেক অধিনায়ক, বিসিবি পরিচালক ও গেম ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ সুজন নেতিবাচকভাবেই উপস্থাপন হন। তবে অনুর্ধ-১৯ দলের ক্রিকেটাররা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর যে তিনি কান্নায় ভাসেন তা মন ছুয়ে যায়। তার হাত ধরেই, তার পরিকল্পনাতেই যুব ক্রিকেটারদের এমন অর্জন মিলে। তিনি যে গেম ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান। চারবারের যুব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন, সবচেয়ে বেশিবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভারত যুব দলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক শিরোপা জয় করেছেন টাইগার যুবারা। ঘনঘন বিদেশ সফরের ফলেই এমন সাফল্য মিলেছে। সুজন সেই গল্প শোনান, ‘সাফল্য এমনি এমনি আসছে না। যুবাদের জন্য অনেক সফরের আয়োজন করেছে বিসিবি। তারা ইংল্যান্ডে খেলেছে, নিউজিল্যান্ডে খেলেছে। বিদেশে প্রায় ৩০টির মতো ম্যাচ খেলেছে আকবর-হৃদয়রা। এর মধ্যে ১৮টিতেই জয় পেয়েছে। যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার নেপথ্য কারণ এটিই। আমরা প্রথমত নাভিদ নেওয়াজকে তরুণদের কোচ হিসেবে নিয়োগ দিই। এরপর দেশের বাইরে খেলাটাকে প্রাধান্য দিই। বোর্ডকে বোঝাই, আমরা যদি বিদেশে না খেলি; তা হলে এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকব। তখন বিসিবিও সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। গেল দুই বছর আমরা একাদশে কোন পরিবর্তন আনিনি। ২০১৮ অনুর্ধ-১৭ দল থেকে আমরা ২০ ক্রিকেটার বাছাই করি। পরে সেখান থেকে আমরা ১৫ জনকে নিই। তারা একসঙ্গে খেলতে খেলতে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে ভাল ধারণা পেয়ে গেছে। মূল পরিবর্তনটা আসে সর্বশেষ বিশ্বকাপের পর। এর আগে একের পর এক ম্যাচ হারছিলাম আমরা।’
অনুর্ধ-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেই ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। এর আগে আইসিসির কোন টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলতে পারেনি দেশের কোন দল। সেই অসাধ্যই সাধন করেছেন আকবররা। চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন। আকরাম জানান, ‘আনন্দের সীমা নেই। এখন এ ক্রিকেটারদের ধরে রাখতে হবে। যেন এদের হাত ধরেই বাংলাদেশ একদিন জাতীয় দলের হয়েও বিশ্বকাপ জিততে পারে। তারা যে আনন্দ আমাদের দিয়েছে তা এক কথায় অসাধারণ। আমাদের গৌরব করার মতো উপলক্ষ দিয়েছেন।’ এই গৌরবে গৌরবান্বিত দেশের জনগণ। জাতি সম্মানিত। যুব ক্রিকেটাররা ইতিহাস গড়েছেন। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। বাংলাদেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করিয়েছেন। আর তাই বিশেষ সংবর্ধনা প্রাপ্যই ছিল। যদিও সংবর্ধনা খুব জমকালো হয়নি। তবে লালগালিচায় বরণ করে, কেক কেটে, ১৯ বার ফায়ার ওয়ার্কস করে সংবর্ধনা দেয়া হয় বিশ্বকাপ জয়ীদের। বীরের বেশে দেশে ফেরা ক্রিকেটারদের সামনে নিশ্চয়ই আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে? সেই প্রত্যাশাই সবার।










































