Home Lead পর্দার আড়ালে মগজ ধোলাই: পর্নোগ্রাফির বিকৃত থাবায় বিপন্ন শৈশব

পর্দার আড়ালে মগজ ধোলাই: পর্নোগ্রাফির বিকৃত থাবায় বিপন্ন শৈশব

6

>>৫ মাসে ১১৮ শিশু ধর্ষণ!


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু নির্যাতন, নৃশংস ধর্ষণ ও বিকৃত যৌন আচারের ঘটনা এক উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ঢাকার পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম হত্যাকাণ্ড সমাজের ভেতরের সেই পচনকেই যেন আরেকবার নগ্নভাবে সামনে এনে দিল। অপরাধ বিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই চরম সামাজিক অবক্ষয় ও বিকৃতির পেছনে মাদকের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে অবাধ পর্নোগ্রাফি ও অনলাইন অশ্লীল কনটেন্টের বিস্তার।


আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া পরিসংখ্যান দেশের বর্তমান পরিস্থিতির এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র তুলে ধরেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে অন্তত ১১৮ জন শিশু নৃশংস ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে আরও ৪৬ জনকে এবং ধর্ষণের পর অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ১৭ জন শিশুকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতিটি অপরাধের পেছনে রয়েছে চরম মানসিক বিকৃতি, যা হঠাৎ করে তৈরি হয় না; বরং দীর্ঘদিন ধরে পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত কনটেন্ট দেখার অবদমিত প্রভাব থেকে গড়ে ওঠে।


রিলস ও শর্ট ভিডিও: ‘সফট পর্ন’-এর নতুন ফাঁদ: পল্লবীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জানা যায়, একই ভবনের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার এই অপরাধের সাথে জড়িত। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মাদকাসক্ত সোহেল রানা স্বীকার করে যে, সে নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখে বিকৃত যৌনতায় অভ্যস্ত ছিল এবং সেই বিকৃতির শিকার বানায় শিশু রামিসাকে।


এক সময় পর্নোগ্রাফি কেবল নির্দিষ্ট কিছু নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে এর রূপ বদলে গেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকের রিলস ও শর্ট ভিডিওর মাধ্যমে এখন প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে তথাকথিত ‘সফট পর্ন’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চতুর অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে যে, কোনো ব্যবহারকারী অসচেতনভাবে একবার এই ধরনের কনটেন্টে ক্লিক করলে, তার স্ক্রিনে একের পর এক একই অনৈতিক কনটেন্ট আসতে থাকে। ফলে স্মার্টফোন হাতে থাকা তরুণ ও কিশোর সমাজ অজান্তেই এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে।


মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অশোক কুমার সাহার মতে, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, মাদকাসক্তি এবং অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব-এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “মানুষ যখন বারবার কোনো চরম বা অনৈতিক কনটেন্ট স্ক্রিনে দেখতে থাকে, তখন একটা সময় মানব মস্তিষ্ক সেটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। এরপর ব্যবহারকারী নিজের উত্তেজনা ধরে রাখতে আরও বেশি চরম ও বিকৃত কনটেন্টের দিকে ঝুঁকতে থাকে এবং বাস্তবে তার প্রয়োগ করতে চায়।”


একই প্রতিধ্বনি শোনা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগের কণ্ঠে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় কেবল ব্যক্তিগত অপরাধপ্রবণতা দায়ী নয়, পর্নোগ্রাফি ও অনৈতিক অনলাইন কনটেন্ট এর পেছনে মূল মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।


নয়াবাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম মুজাম্মিল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, এই সমস্যা এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এবং সব স্তরে পৌঁছে গেছে। মানুষের নৈতিক স্খলন এমন পর্যায়ে গেছে যে, এই ভয়াবহ অপরাধগুলোকেও অনেকে এখন আর অপরাধ মনে করছে না।


কঠোর আইন ও যৌথ টাস্কফোর্সের নজরদারি: অনলাইন পর্নোগ্রাফি ও অনৈতিক কনটেন্টের এই জোয়ার রুখতে দেশের আইনি কাঠামোকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২’ অনুযায়ী বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এর পাশাপাশি, সদ্য প্রণীত ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এ পর্নোগ্রাফি এবং অনৈতিক কনটেন্ট ছড়ানোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ধারা যুক্ত করা হয়েছে।


ভার্চুয়াল জগতের এই অদৃশ্য মহামারি রুখতে ইতিমধ্যেই সিআইডি (CID), বিটিআরসি (BTRC), এনএসআই (NSI) এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) সম্মিলিতভাবে একটি শক্তিশালী যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। অপরাধীদের আর্থিক লেনদেন ও সাইবার কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ বা সরকারি কঠোরতা দিয়ে এই সামাজিক ক্যানসার নিরাময় সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা এবং সুস্থ বিনোদনের অবাধ সুযোগ তৈরি করা।