অনিরাপদ পানি, হুমকিতে কৃষি-পরিবেশ
বাপী দে।।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন রাজবাঁধ| প্রতিদিন এখানে জমা হয় ৫শতাধিক মেট্রিক টন গৃহস্থালি ও মেডিকেল বর্জ্য| বছরের পর বছর এসব বর্জ্য পচে ˆতরি হচ্ছে কালো বিষাক্ত তরল লিচেট, যা কোনো শোধন ছাড়াই মাটির গভীরে প্রবেশ করছে| ফলে মহানগরীর খুলনার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষক ও পরিবেশবাদীরা|

খুলনার রাজবাঁধ এলাকায় সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ফেলার স্থান (ডাম্পিং সাইট) থেকে নির্গত লিচেট (বর্জ্য ধোয়া বিষাক্ত পানি) ও এর আশপাশের ভূপৃষ্ঠের পানির গুণাগুণ নিয়ে ২০২২ সালেরর এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে| খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের গবেষক ফাতেমা মোহনাজ ও তাঁর সহকর্মীদের ‘ক্যারেক্টারাইজেশন অব সলিড ওয়েস্ট লিচেট অ্যান্ড ইটস ইমপ্যাক্ট অন সারফেস ওয়াটার কোয়ালিটি: অ্যা কেস স্টাডি অ্যাট রাজবাঁধ, খুলনা-শীর্ষক এক গবেষণাটি করেন|
গবেষণা বলছে, খুলনা মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অবহেলা এখন জন¯^াস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে| রাজবাঁধ ডাম্পিং স্টেশনে প্রতিদিন জমা হওয়া শত শত টন বর্জ্যের লিচেট প্রতি বর্ষায় ছড়িয়ে পড়ছে কৃষি জমি ও জলাশয়ে| অপরদিকে বিষাক্ত লিচেটে খুলনার ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে সুপেয় পানির আধারেকে করছে দুষিত|

গবেষণায় দেখা গেছে যে লিচেটের মান অত্যন্ত ক্ষারীয়, যা বর্জ্যের ˆজব উপাদানগুলোর পচন নির্দেশ করে| লিচেটে উচ্চমাত্রার ইলেকট্রিক্যাল কন্ডাক্টিভিটি ও টোটাল ডিজলভড সলিডস পাওয়া গেছে, যা অজৈব পদার্থ এবং লবণের উপস্থিতির প্রমাণ দেয়| বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী উভয় ঋতুতেই ভূপৃষ্ঠের পানিতে উচ্চমাত্রার বিওডি (বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড) ও সিওডি (কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড) পাওয়া গেছে| বর্ষাকালে সিওডির গড় মাত্রা ছিল ১১৭ দশমিক ৮০ মিলি গ্রাম/লিটার ও বর্ষা-পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৯ দশমিক ৩৯ মিলি গ্রাম/লিটার | গবেষণা সেখানকার পানিতে ক্ষতিকারক ভারী ধাতু সিসা, ক্যাডমিনিয়াম, ক্রোমিয়াম, আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পাওয়া গেছে| ফলে ওই এলাকার চারপাশের পানি বর্তমানে যেমন গৃহস্থালি কাজের জন্য নিরাপদ নয়| তেমনি এর দূষণ কৃষি জমি ও জন¯^াস্থ্যের জন্য চরম হুমকি ¯^রূপ|
খুলনায় জাতিসংঘের ‘ওয়েস্ট ওয়াইজ সিটি টুল’ ব্যবহার করে ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনাবিদ আবির উল জব্বারের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে এখানে প্রতিদিন প্রায় ৭৩২ টন বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে| যার মধ্যে করপোরেশন প্রতিদিন ৪৬১ টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছে; বাকি বর্জ্য ড্রেন, খাল ও নদীতে ফেলা হয় যা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে পড়ে| উৎপাদিত বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে রান্নাঘর/ক্যান্টিন বর্জ্য ৭৭ – ৮০ শতাংশ, প্লাটিক ফিল্ম ৩-৫ শতাংশ, কাগজ-বোর্ড ৫ শতাংশ ও বাকি অংশ কঠিন প্লাটিক, ধাতু, কাঁচ ও টেক্সটাইল প্রভৃতি| অবশ্য বেসরকারি হিসেবে নগরীতে প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদনের পরিমান প্রায় এক হাজার থেকে ১২’শ মেট্রিক টন|

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, খুলণায় যেসব এলাকায় বর্জ্য ডাম্পিং হচ্ছে, সেখানে লিচেটের বিষয়টি ভাবা হয়নি| ফলে সহজেই লিচেট আশপাশের জমি-নদ-নদী-খাল-বিল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে| বর্ষা মৌসুমে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে| অনেকে ক্ষেত্রে এই লিচেট ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে প্রবেশ করা ও তা ছড়িয়ে পড়া অ¯^াভাবিক নয়| ইতিমধ্যে তা ১০০-১৫০ ফিটের মধ্যে মিশে গেছে|
এই পানির ব্যবহার করে উৎপাদিত ফসল-সবজি, মাছও ¯^াস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ| বিশেষ করে মেডিক্যাল বর্জ্যরে মধ্যে ক্ষতিকারক রোগ-জীবানু, রাসায়নিক উপাদান জন¯^াস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি ¯^রূপ| এ পানি দীর্ঘদিন পান করলে কিডনি রোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে|
ড. আব্দুল্লাহ এখনই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী বলে উল্লেখ করেন| তিনি বলেন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, লিচেট যাতে বাইরে যেতে না পারে সেখানে দেয়াল দেয়া, রিসাইক্লিং পদ্ধতি চালু করা জরুরি|
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী হামিদুল বারী সাংবাদিকদের বলেন, ময়লা সব জায়গায় না ফেলে একস্থানে ফেলা ভাল| রাজবাঁধের লিচেটের ক্ষতির বিষয়টি ভাবতে হবে| তবে খুলনার পানিস্তর অন্যসব এলাকা থেকে কিছুটা ভিন্ন| বিশেষ করে ক্লে-লেয়ার ভেদ করে লিচেট প্রবেশ করে খুব বেশি দূরে যেতে পারবে না| তারপরও লিচেট আটকে রাখতে লাইনার করা, রিসাইক্লিং করা যেতে পারে| তবে কোনভাবেই তা পুনব্যবহার করা যাবে না|

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের কনজারভেন্সি অফিসার আনিসুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে কাজ করছে| নগরীর শলুয়ায় ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ হয়েছে| এটি চালু হলে লিচেট ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হবে|











































