খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্বশুরবাড়ি সিলেটে আগামীকাল শনিবার আসছেন তারেক রহমান। সে উপলক্ষে নগরকে নানাভাবে সাজিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী ও সিলেটের জামাইকে বরণ করতে ইতিমধ্যে প্রস্তুত পর্যটন ও আধ্যাত্মিক নগরী সিলেট।
এই সফরে সিলেটের উন্নয়নে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি মহাপরিকল্পনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সুরমা নদীকেন্দ্রিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, স্লুইসগেট স্থাপন এবং নদীর দুই তীরজুড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ওয়াকওয়ে ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া সদর উপজেলার কান্দিগাঁওয়ে বাসিয়া নদী খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন তিনি, যা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে প্রথম শুরু করেছিলেন। একই দিনে জিন্দাবাজারে ওভারসিজ সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
নগরজুড়ে উৎসবের আমেজ
নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফর ঘিরে পুরো নগরজুড়ে একধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসবিষয়ক ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে নগরী। এই সফরকে সামনে রেখে প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দফায় দফায় বৈঠক করছে। বেশ কয়েকটি প্রস্তুতিমূলক সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিলেট নগরের প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও স্থাপনাগুলো নতুন করে সাজানো হচ্ছে। রাস্তা মেরামত, সড়কের পাশে গাছপালা ছাঁটাই, সরকারি ভবনের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। সিলেট সিটি করপোরেশন অপ্রয়োজনীয় ব্যানার-ফেস্টুন এরই মধ্যে অপসারণ করেছে।
নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে দিনে-রাতে সমানতালে চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। সিলেট সার্কিট হাউস-সংলগ্ন চাঁদনীঘাট এলাকা সাজানো হচ্ছে নতুন করে। নগর ভবনে বানানো হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন প্যান্ডেল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশা নিধন কার্যক্রমসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক দপ্তরের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠে কাজ করছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট, নজরদারি এবং প্রটোকল অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরের সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিটি স্থান আগেভাগেই প্রস্তুত রাখা হচ্ছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে শুধু প্রশাসনিক নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নগরের বিভিন্ন স্থানে স্বাগত ব্যানার, আলোকসজ্জা এবং দলীয় কর্মসূচির কারণে একধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে কয়েক দিন ধরে নগরীতে স্বাগত মিছিল বের করা হয়। বিএনপি ছাড়াও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও তিন দিন ধরে বের করা হচ্ছে স্বাগত মিছিল।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি
আগের কর্মসূচিগুলো অপরিবর্তিত রেখে সফরসূচিতে কেবল আগামীকাল শনিবার বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার সিলেটের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত সফরসূচিতে বলা হয়, শনিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। বেলা ১১টায় নগরের চাঁদনীঘাট এলাকায় সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন ও সুধী সমাবেশে যোগ দেবেন।
দুপুর ১২টায় সদর উপজেলার কান্দিগাঁওয়ে জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাসিয়া খাল (বাসিয়া নদী) খননকাজের উদ্বোধন করবেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে প্রথম এই খাল উদ্বোধন করেছিলেন।
বেলা ৩টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করবেন তিনি। বিকেল ৫টায় সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় সভায় অংশগ্রহণ শেষে সন্ধ্যা ৭টার ফ্লাইটে বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ করবেন।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সিলেট নগরকে ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে সুরমা নদীকেন্দ্রিক একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সিসিক। নদীর দুই তীরজুড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকা সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নদীর দুই তীরে শক্তিশালী বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য ওয়াকওয়ে নির্মাণ, নদীতীর সৌন্দর্য বর্ধন, স্লুইসগেট স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এখানে আসছেন, মূলত খেলাধুলা উদ্বোধন করার জন্য। এটা আমাদের জন্য অনেক পাওয়া, একটা বড় পাওয়া। আর দ্বিতীয়ত, পাশেই বাসিয়া নদী এবং মরা নদী যেটা আছে, সেই নদীতে আমাদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এখানে খনন করেছিলেন, সেই নদীটা পুনঃখনন হবে। তা ছাড়া আমাদের সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে অনেকগুলো প্রজেক্ট আছে, সেটিও উদ্বোধন করবেন।’
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। একই সাথে আমাদের প্রবাসীদের জন্য একটি ওভারসিজ সেন্টার, প্রবাসী কল্যাণ ভবনে সেটির উদ্বোধন করবেন। এই প্রোগ্রামগুলো এখানে আছে। আমরা আমাদের সবগুলোতে ভেন্যুতে যে প্রস্তুতি দরকার, মোটামুটি প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আমাদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বরণ করে নেব।’
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফর নিয়ে আজ বিকেলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভিভিআইপি প্রটোকল টিমের সদস্য ছাড়াও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিবি, সিটিএসবিসহ পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে ভিভিআইপি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ ব্যতীত নির্ধারিত রুট, অবস্থানস্থল ও ভেন্যুর ৫০০ মিটার পরিধি ও দুই কিলোমিটার উচ্চতায় ড্রোন বা উড্ডয়ন যান ওড়ানো নিষিদ্ধ করেছে এসএমপি।










































