শ্যামনগর প্রতিনিধি
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগরে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ খেজুর গাছ ও খেজুরের রস সংগ্রহের সংস্কৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার ভয়াবহতা, সুপেয় পানির সংকট ও নানা পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফলে এক সময়ের সমৃদ্ধ খেজুর গাছ আজ বিলুপ্তির পথে। শীতের সকালে খেজুর রসের মিষ্টি ঘ্রাণে গ্রাম জুড়ে এক উৎসবের যে আমেজ ছড়িয়ে পড়তো, তা এখন খুব কমই নজরে পড়ে।
স্থানীয়দের মতে, এক সময় শ্যামনগরের গ্রামীণ রাস্তাগুলোর দুই ধারে সারি সারি খেজুর গাছ দেখা যেত। শীত এলেই গাছিরা কোমরে দড়ি বেঁধে গাছে উঠে ভাড় বসিয়ে দিতেন রস সংগ্রহের জন্য। পরদিন সকালে সেই রস দিয়ে ফিরনি, পায়েস, ভাপা পিঠা, মুড়ির মোয়া, চিতই পিঠাসহ নানা সুস্বাদু খাবার তৈরি হতো। বাড়তি রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করে বিক্রি করতেন তারা। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না বললেই চলে।
শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এখানে লবণাক্ততার পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে আইলা ও ২০২০ সালে আম্পান ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে লবণাক্ততা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে লবণাক্ত পানি জমির গভীরে প্রবেশ করায় মাটির উর্বরতা কমে যায়, যার ফলে নতুন করে খেজুর গাছ জন্মাচ্ছে না। পুরনো গাছগুলোও ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খেজুর গাছ লবণাক্ত পরিবেশ সহ্য করতে পারে না। অতিরিক্ত লবণাক্ততা গাছের শিকড়ের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে, ফলে গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং রস উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এ কারণে গাছিরা আগের মতো আর রস সংগ্রহ করতে পারছেন না।
এক সময় এই এলাকার শতাধিক গাছি শীতের মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু পর্যাপ্ত খেজুর গাছ না থাকায় অনেকেই এখন এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেছেন, আবার কেউবা অটো রিকশা, ভ্যান কিংবা মিশুক চালাচ্ছেন।
গাছি নাজির সরদার (৫৫) আক্ষেপ করে বলেন, “আগে প্রতি শীতের মৌসুমে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতাম। সকাল হলেই লোকে লাইন ধরে রস কিনতে আসত। এখন তো গাছই নেই, রস পাবো কোথায়?”
আরেক গাছি শুকুর আলী সরদার বলেন, “আগে দিনে ২০-৩০ হাঁড়ি রস পেতাম, এখন ৫ হাঁড়িও পাওয়া কঠিন। তাই বাধ্য হয়ে অন্য কাজের মাধ্যমে রুটি রুজির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।”
পরিবেশবিদদের মতে, খেজুর গাছ রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। লবণাক্ততা প্রতিরোধের জন্য নতুন খেজুর গাছের চারা রোপণ ও লবণ সহনশীল জাতের গাছ গবেষণা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রাস্তার ধারে, বসতবাড়ির আশপাশে, স্কুল-কলেজের মাঠে খেজুর গাছ রোপণ করতে হবে। খেজুর গাছ সংরক্ষণ ও পুনরায় লাগানোর জন্য বিশেষ প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন।
খেজুর গাছ শুধু রস বা গুড়ের জন্য নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্যেরও অংশ। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও অবহেলার কারণে এটি হারিয়ে যেতে বসেছে। সময় থাকতেই উদ্যোগ নেওয়া না হলে, হয়তো একসময় বইয়ের পাতায় বা প্রবীণদের স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে শীতের সকালে খেজুর রসের মিষ্টি গল্প। এজন্য সকল নাগরিককে নিজ দায়িত্বে খেজুর গাছ রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আবার ফিরে পায় বাংলার হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য।










































