রকিবুল ইসলাম মতি।।
চারপাশে চিরচেনা কোলাহল, অথচ ১২ বছর বয়সী মেয়েটির দৃষ্টি আটকে থাকে দূর কোনো এক অদৃশ্য ক্যানভাসে।পড়ার টেবিল, পাঠ্যবইয়ের সাদা মার্জিন কিংবা ডায়রির পাতা সুযোগ পেলেই যার আঙুলগুলো তুলে নেয় রং-তুলি।এই রং আর রেখাই তার ভাষা, তার একান্ত আশ্রয়। সে খুলনার নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নায়লা তাসনীম জামান। লেখাপড়ায় ক্লাসের সেরা তো বটেই, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক খুদে চিত্রশিল্পীও সে। তবে এই মুহূর্তে এই বিস্ময়বালিকার সব ধ্যান-জ্ঞান আটকে আছে একটি বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণে খুলনায় আসন্ন সরকারি সফরে সরকারপ্রধানের হাতে নিজের যত্নে আঁকা একটি চিত্রকর্ম তুলে দেওয়া।

সম্প্রতি শিশু অধিকার বিষয়ক এক আয়োজনে সরকারপ্রধানের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি কথা বলার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল নায়লার। সরকারপ্রধানের সামনে নিজের উপস্থিতি তুলে ধরা আর সেই অমূল্য স্মৃতিকে ধরে রাখার ব্যাকুলতায় সে পুরো এক রাত না ঘুমিয়ে এঁকে ফেলেছিল প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের ছবি।অনুষ্ঠান চলাকালে কথা বলার এক ফাঁকে তার ছবি দেখিয়েছিলেন আর সেই ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে সরকারপ্রধান নিজ মুখে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন খুলনা সফরে এলে নায়লার সঙ্গে দেখা করবেন,দেখবেন তার আঁকা ছবি।
আগামী ৫ নভেম্বর খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস এর আসরকে কেন্দ্র করে এখন সেই প্রতীক্ষার ক্ষণ গুনছে নায়লা ও তার পরিবার।
সরকারপ্রধানের সঙ্গে প্রথম কথোপকথনের স্মৃতি মনে পড়লে এখনো রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে নায়লা।বয়সের তুলনায় পরিণত এই খুদে শিল্পী বলে, যেকোনো মানুষেরই সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলতে গেলে একটু নার্ভাস লাগা স্বাভাবিক। আমারও ভয় আর আনন্দের একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। তবে ভয়ের চেয়ে আনন্দটাই ছিল অনেক বেশি। সেই আবেগটা ভাষায় বোঝানোর সাধ্য আমার ছিল না, তাই ঠিক করেছিলাম তুলির আঁচড়েই মনের কথা বলব। কথা বলার আগের রাতটা আমি বসেই কাটিয়ে দিয়েছিলাম ক্যানভাসের সামনে।
ভার্চ্যুয়াল সেই অনুষ্ঠানে নায়লার আঁকা ছবিটি যখন তার সামনে দেখানো হয়, তখন তা কেবল প্রশংসাই কুড়ায়নি, তৈরি করেছিল এক আন্তরিক মানবিক সেতুবন্ধন। যার ফলশ্রুতি হিসেবে আসে খুলনায় সশরীরে সাক্ষাতের আশ্বাস।
নায়লার এই শিল্পযাত্রার সূচনা হঠাৎ করে নয়। ঠিকমতো বর্ণমালা শেখার আগেই, মাত্র চার বছর বয়সে ছবি আঁকা শুরু করে সে। মেঝেতে রঙের ছোপ কিংবা নতুন পোশাক নষ্ট হওয়াকে অপচয় বা দুষ্টুমি না ভেবে তার পরিবার সবসময় পাশে থেকেছে। নায়লার মা জানালেন মেয়ের ভেতরে গড়ে ওঠা এক সমান্তরাল কল্পনার জগতের কথা, যাকে তিনি ডাকেন ‘আনটোল্ড এস্কেপ’ বলে।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নায়লা মা বলেন,নায়লা স্বভাবগতভাবেই বেশ অন্তর্মুখী। মুখের কথায় নিজের গভীর অনুভূতি ও সহজে প্রকাশ করতে পারে না রং-তুলিই ওর মনের কথা বলার প্রধান মাধ্যম। ও যখন আঁকতে বসে, তখন যেন এই বাস্তব জগতে থাকে না। শৈশবেই এক অভিজ্ঞ শিশু বিশেষজ্ঞ ওর এই ব্যতিক্রমী মেধা শনাক্ত করে আমাদের সতর্ক করেছিলেন সঠিক পরিচর্যা না পেলে এই প্রতিভা থমকে যেতে পারে। আমরা সেই পরামর্শকে হৃদয়ে ধারণ করেছি।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মাত্র দুই-তিনটি প্রাথমিক রং চোখের পলকে মিশিয়ে জটিল ও চমৎকার সব শেড তৈরি করে ফেলা নায়লার জন্য একদম সহজাত। ক্যানভাসের সাথে এই আট বছরের গভীর মিতালী আজ তাকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।
নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক ও প্রি-স্কুল কো-অর্ডিনেটর ফারজানা ইয়াসমিন নায়লাকে বর্ণনা করলেন এক কমপ্লিট প্যাকেজ হিসেবে। তিনি বলেন, দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ইংরেজি মাধ্যমে ওর ভাষার দখল এবং সৃজনশীল লেখার হাত আমাদের মুগ্ধ করত। পড়াশোনার পাশাপাশি বিতর্ক, নাচ, গান, খেলাধুলা সবকিছুতেই সে প্রথম সারিতে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত হওয়া ওর বহুমুখী প্রতিভারই প্রমাণ।
শিক্ষিকা আরও যোগ করেন, সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলার সময় ভিডিওতে আমরা ওর যে অটুট আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের ছাপ দেখেছি, তা এক কথায় বিরল।
নায়লার তুলির জাদু শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতের কলকাতার বেঙ্গল সোসাইটি থেকে অর্জন করেছে স্বর্ণপদক, ভূষিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মাননা অঙ্কন রত্ন উপাধিতে। ফ্রান্সসহ বিদেশের নানা প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে তার সৃষ্টি।এমনকি বিশ্বখ্যাত এক আন্তর্জাতিক শিল্পসমালোচক নায়লার কাজের পরিপক্বতা ও রঙের ব্যবহারে চমৎকৃত হয়ে তার একটি মূল চিত্রকর্ম নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহে যুক্ত করেছেন এবং একটি শুভেচ্ছা চিঠি পাঠিয়ে নায়লার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেছেন।
বয়স মাত্র বারো হলেও নায়লার চিন্তাভাবনা তার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। সে কেবল নিজের সাফল্যে তৃপ্ত থাকতে চায় না। তার স্বপ্ন বড় হয়ে একজন ‘গ্লোবাল লিডার’ বা বিশ্বমানের নেতা হওয়া, যে সারা বিশ্বের বঞ্চিত শিশুদের পক্ষে কথা বলবে।
সরকারপ্রধানের কাছে নিজের ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়েও বড় এক দাবি রয়েছে এই খুদে শিল্পীর। নায়লা বলে, আমি ভাগ্যবশত সুযোগ পেয়েছি বলেই আমার ছবি আঁকার হাতটা বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে এমন অসংখ্য শিশু আছে,যাদের ছবি আঁকা,গান গাওয়া বা খেলাধুলার মতো দারুণ সব মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল সুযোগের অভাবে তা হারিয়ে যায়। সরকারপ্রধানের কাছে আমার আকুল আবেদন তিনি যেন দেশের প্রতিটি প্রান্তের প্রতিটি শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য সমান সুযোগ ও মাঠ তৈরি করে দেন।
জেলা স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া উৎসবের বর্ণিল আয়োজনে যখন সরকারপ্রধান পা রাখবেন,তখন হাজারো মানুষের মাঝে অপেক্ষা করবে একজোড়া উজ্জ্বল চোখ। যার হাতে থাকবে দেশের শীর্ষ নেতার জন্য পরম ভালোবাসায় আঁকা এক খণ্ড চিত্রকর্ম।











































