নড়াইল প্রতিনিধি।।
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় বিদেশি ফল চাষে পাল্টে গেছে অনেক কৃষকের ভাগ্য। ফলে বদলে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রও। একসময় এ উপজেলায় ইরি-বোরো ও আমন ধান চাষের পাশাপাশি প্রচলিত শাকসবজি চাষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন আধুনিক পদ্ধতিতে নানা জাতের বিদেশি ফলের চাষ মাধ্যমে কৃষকেরা লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। ফলে ক্রমেই কৃষকদের কাছে বিদেশি ফল চাষ এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কৃষকেরা এখন- ড্রাগন, মাল্টা, লংকন, আনার, শরিফা ও আঙুরের মতো ভিনদেশি ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, উর্বর পলিমাটিতে বিদেশি ফল চাষে খরচ কম, আবার ফলনও ভালো হয়। ফলে চাহিদা বাড়ছে এবং বাজারেও মিলছে ভালো দাম।
লোহাগড়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৩ হেক্টর জমিতে ছোট-বড় ৬টি ড্রাগন বাগান রয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, জয়পুর ইউনিয়নের চাচই কেয়ার কালনা-লাহুড়িয়া সড়কের দক্ষিণ পাশে ৯০ শতাংশ জমিতে এক হাজার পিলারের ওপর শোভা পাচ্ছে ১২ হাজার সবুজ ড্রাগন গাছ।
ড্রাগন বাগানের মালিক কৃষক আনিসুর রহমান জানান, এখানে রেড ভেলভেট, আমেরিকান বিউটি, ভিয়েতনাম রেড, ভিয়েতনাম হোয়াইট ও পলোরা জাতের ড্রাগন গাছ রয়েছে। তিনি ড্রাগন চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি বলেন, এলাকার তিনজনের কাছ থেকে বছরে এক কানি জমির জন্য এক হাজার টাকা হিসাবে ১০ বছরের জন্য ৯০ শতাংশ জমি ২০২৪ সালে ইজারা নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ শুরু করেছেন।
তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় তিনি ড্রাগন ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। প্রথম বছরে এক থেকে দুই লাখ টাকার এবং দ্বিতীয় বছরে প্রায় ৩ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন। তবে এ বছর ৫ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি হবে বলে তিনি আশা করছেন।
শালনগর ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ রওশন আলী জানান, ৬০ শতাংশ জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করেছেন তিনি। শুধু বছরে ১ থেকে ৩ বার বিভিন্ন ধরনের সার প্রয়োগ করতে হয়। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে ড্রাগন বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়। এখন তার বাগানে গড়ে প্রতি মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার কেজি ড্রাগন ফল সংগ্রহ করা যায়। এ বছর ড্রাগনের ফলন ভালো হয়েছে। বাগান থেকে প্রতি কেজি ৭৫ থেকে ৮০ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করেন তিনি। লোহাগড়া বাজার, কালিয়া বাজার, নড়াইল সদরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে ব্যাপারীরা বাগানে এসে ড্রাগন ফল কিনে নিয়ে যান।
ড্রাগন বাগানের পরিচর্যাকারী শ্রমিক আহাদুর রহমান বলেন, তিনি দুই বছর ধরে ছত্রহাজারী গ্রামের হাবীবুর রহমানের ড্রাগন বাগানে শুরু থেকেই কাজ করছেন। তবে খুব সহজ পদ্ধতিতে বাগান তৈরি করা যায়। এটি খুব বেশি পরিশ্রমের কাজ নয়। সবসময় খেয়াল রাখতে হয়, যেন পোকামাকড় বা রোগবালাই গাছের কোনো ক্ষতি করতে না পারে। এ বাগান দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত লোক আসছেন। সবুজে সবুজে ছাওয়া বিশাল এই বাগান দেখে ড্রাগন চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন অনেকেই।
নওয়াগ্রাম ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুশান্ত কুমার বলেন, ড্রাগন ফলের চারা লাগানোর এক বছরের মধ্যে ফল আসতে শুরু করে। পুষ্টিগুণ, আকার-আকৃতি ও দামের কারণে বাজারে এ ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ক্যাকটাসজাতীয় গাছ হওয়ায় রোগবালাইও কম। তাই সহজেই এ ফল চাষ করা যায়। অল্প সময়ে বাগানে ফল আসতে শুরু করে, তাই এটি একটি লাভজনক চাষ। নতুন কেউ এর চাষ করতে চাইলে আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করব।
লোহাগড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মুনমুন সাহা বলেন, ড্রাগন একটি বিদেশি ও জনপ্রিয় ফল। বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে এই ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একবার রোপণ করা গাছ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফল চাষ করে অনেক কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।











































