মিলি রহমান।।
উচ্চ কোলেস্টেরলকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলেও সাধারণত এর কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ দেখা যায় না। বিশেষ করে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ধমনির ভেতরে চর্বি জমতে পারে। এতে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
বংশগত কারণ, বয়স ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা কোলেস্টেরলের মাত্রাকে প্রভাবিত করলেও আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমন কিছু অভ্যাস রয়েছে, যেগুলো এক-দুবার করলে ক্ষতিকর মনে না হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে। চলুন সেগুলো জেনে নেওয়া যাক-
১. সকালের নাস্তায় অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার
মাখন দেওয়া টোস্ট, পরোটা, ভাজাপোড়া কিংবা প্রক্রিয়াজাত মাংস দিয়ে দিনের শুরু করা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক। তবে এসব খাবারে থাকা স্যাচুরেটেড ফ্যাট নিয়মিত বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে। মাখন, ঘি, চর্বিযুক্ত মাংস, সসেজ, পনির, ক্রিম, কেক ও পেস্ট্রিতে এ ধরনের ফ্যাট বেশি থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক মোট ক্যালোরির ১০ শতাংশের বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট থেকে না নেওয়াই ভালো।
২. স্বাস্থ্যকর খাবারও অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া
বাদাম, বীজ ও কিছু নির্দিষ্ট তেল স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে কোনো খাবার পুষ্টিকর হলেই তা ইচ্ছেমতো বেশি খাওয়া ঠিক নয়। পরিমাণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকসের পরিবর্তে বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি, ভাজা খাবার বা প্যাকেটজাত মুখরোচক খাবার নিয়মিত খেলে সমস্যা বাড়তে পারে। এসব খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালোরিও থাকতে পারে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের খাদ্যতালিকা বিষয়ক নির্দেশনায় কম প্রক্রিয়াজাত খাবার, শাকসবজি, ফল, হোলগ্রেইন, শিমজাতীয় খাবার, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎসকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি সীমিত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
৩. দীর্ঘ সময় বসে থাকা
প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম করলেও যদি দিনের বাকি সময়টা ডেস্ক, গাড়ি কিংবা সোফায় বসে কাটে, তাহলে তা শরীরের জন্য ভালো নাও হতে পারে। দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন স্বাস্থ্যকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বজায় রাখার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এলডিএল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে এবং এইচডিএল বা ‘ভালো’ কোলেস্টেরলকে সহায়তা করতে পারে। এজন্য খুব কঠিন ব্যায়াম করতেই হবে এমন নয়। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কিংবা সিঁড়ি ব্যবহার করাও উপকারী।
সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ অথবা ৭৫ মিনিট বেশি তীব্রতার ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ানো, ফোনে কথা বলার সময় হাঁটা কিংবা সম্ভব হলে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করাও ভালো অভ্যাস হতে পারে।
৪. নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় পান করা
সফট ড্রিঙ্কস, অতিরিক্ত মিষ্টি ফলের জুস, এনার্জি ড্রিঙ্ক কিংবা চিনি দেওয়া চা-কফি থেকে অজান্তেই শরীরে প্রচুর পরিমাণে চিনি প্রবেশ করতে পারে। অথচ এসব পানীয় পেট ভরানোর ক্ষেত্রে তেমন কার্যকর নয়।
চিনি ও খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়। তবে অতিরিক্ত চিনি শরীরে বাড়তি ক্যালোরি যোগ করে ওজন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. ধূমপান ও তামাকের সংস্পর্শ
ধূমপান শুধু ফুসফুস নয়, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি কোলেস্টেরলের মাত্রাকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
ধূমপানের কারণে রক্তনালীর ক্ষতি হয় এবং অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে এটি এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে হৃদরোগের সামগ্রিক ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তাই ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করা হৃদপিণ্ড ও রক্তনালীর সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে।











































