Home আঞ্চলিক স্কুলে পৌঁছাতে কাদায় মাখামাখি, ব্যাগে বইয়ের সঙ্গে তাই বাড়তি পোশাক

স্কুলে পৌঁছাতে কাদায় মাখামাখি, ব্যাগে বইয়ের সঙ্গে তাই বাড়তি পোশাক

0


শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি।।

স্কুলব্যাগে বই-খাতার পাশাপাশি ভাঁজ করে রাখা থাকে আরেক সেট জামা-প্যান্ট। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় গায়ে যে পোশাক থাকে, বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেটি কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। তাই শ্রেণিকক্ষে ঢোকার আগে বদলে নিতে হয় পোশাক। বিকেলে ছুটির পর আবার কাদা মাড়িয়ে সেই পথেই ফিরতে হয় বাড়ি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন মরাগাং গ্রামের ১৬৫ নম্বর পূর্ব মরাগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বর্ষাকালের প্রতিদিনের চিত্র এটি।

সম্প্রতি বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনকের সামনে নিজেদের সন্তানের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন অভিভাবকেরা।

প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ধৃতরাজ মণ্ডলের মা নমিতা রানী মণ্ডল বলেন, প্রায় দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার কাদা-পানি পেরিয়ে সন্তানকে স্কুলে আনতে হয়। রাস্তা এতটাই খারাপ যে একা পাঠানোর সুযোগ নেই। তাই প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছে দেন, আবার ছুটির সময় এসে নিয়ে যান। কাদা মাড়িয়ে আসার জন্য এক সেট পোশাক এবং ক্লাস করার জন্য আরেক সেট পোশাক সঙ্গে আনতে হয়।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান প্রিয়াংকা মণ্ডল। তার দুই সন্তান অনামিকা ও মিহির এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, বর্ষা এলেই শিশুরা স্কুলে যেতে চায় না। বাধ্য হয়ে প্রতিদিন সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হয়। দুই সেট পোশাক না আনলে কাদামাখা কাপড়ে ক্লাস করা সম্ভব হয় না।

অভিভাবকদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের পূর্ব দিকের প্রায় তিন কিলোমিটার কাঁচা সড়ক বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে সেটি কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। উপকূল রক্ষা বাঁধই বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র পথ। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো রাস্তা কাদায় ঢেকে যায়। তখন বই-খাতা, স্কুলব্যাগ, পোশাক সবই কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। অনেক শিশু এ কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে চায় না।

দুর্ভোগের কথা জানায় শিক্ষার্থীরাও। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হোসাইন বলে, আমাদের রাস্তা অনেক খারাপ। আসতে গিয়ে বই-খাতা ভিজে যায়, অনেক কষ্ট হয়। আরেক শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার বলে, স্কুলে আসতে গেলে জামা-কাপড় কাদায় ভিজে যায়। হিয়া, জাহিদসহ আরও অনেক শিশুর মুখেও একই অভিযোগ। কেউ কাদায় পিছলে পড়ে, কারও বই-খাতা ভিজে যায়, কেউ আবার কাদা দেখে স্কুলেই আসতে চায় না।

বই খাতা আর জামা প্যান্ট কাঁদায় লেপ্টে যায় উল্লেখ করে অভিভাবকরা বলেন, স্কুলে যাতায়াতের একমাত্র রাস্তা উপকূল রক্ষা বাঁধ। সামান্য বৃষ্টি হলে গোটা রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ক্লাস করার জন্য অন্তত দুই সেট পোশাক নিয়ে স্কুলে আসতে হয় শিশুদের। রাস্তার এ বেহাল দশার কারণে অনেক শিশু বর্ষাকালে স্কুলে আসতে চায় না।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনিমেষ কুমার মৃধা বলেন, রাস্তার কারণে ছোট ছোট শিশুদের প্রতিদিনই সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অধিকাংশ অভিভাবক দুই সেট পোশাক নিয়ে সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেন। ছুটির সময় আবার এসে পোশাক বদলে বাড়ি নিয়ে যান। এই ভোগান্তির কারণে অনেক পরিবার নিয়মিত সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারছে না।

স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল বলেন, বিদ্যালয়ের পাশের প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের বেহাল অবস্থা দীর্ঘদিনের। প্রায়ই শিশুরা কাদায় পিছলে পড়ে আহত হয়। সুন্দরবন-সংলগ্ন প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও হচ্ছে না।

বিদ্যালয়ের শিশুদের দুর্ভোগ সরেজমিনে দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক। তিনি বলেন, মরাগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা টানা কয়েক বছর জাতীয় স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের পুরস্কার দিতে এসে যে যোগাযোগব্যবস্থার চিত্র দেখেছি, তা অত্যন্ত করুণ। কোমলমতি শিশুদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

উল্লেখ্য, ১৬৫ নম্বর পূর্ব মরাগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্কুল ফুটবলে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৪ ও ২০২৬ সালে জাতীয় পর্যায়ের প্রথম রাউন্ডে এবং ২০২৫ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে বিদ্যালয়টি। সেই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে গত ৩০ জুলাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের ক্রেস্ট, স্কুলব্যাগ ও ফুটবল উপহার দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠে সাফল্য এনে দেওয়া এসব শিশুর প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় লড়াই এখনো কাদামাখা সেই পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো।