যশোর অফিস।।
সরকারি তদারকির অভাবে ঝিমিয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম আইটি হাব যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের কার্যক্রম।
দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া, নষ্ট হয়ে আছে সেন্ট্রাল এসি, বন্ধ রয়েছে দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণও। পাশাপাশি পার্কের ভেতরে মাদকসেবীদের আনাগোনা এবং নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা। এ অবস্থায় দেশের আইটি খাতের এই বড় বিনিয়োগকে বাঁচাতে দ্রুত সরকারি তদারকি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সম্ভাবনার বিশাল দুয়ার খুলে দিতে যে আইটি পার্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে বন্দি। সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক তদারকি ও নজরদারি না থাকায় পার্কের সার্বিক কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ছে।
দীর্ঘ দুই বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে পার্কের কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি)। গরমে অতিষ্ঠ কর্মী আর উদ্যোক্তারা বারবার তাগিদ দিলেও তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। এছাড়া দক্ষ জনবল তৈরির উদ্দেশ্যে এই পার্ক গড়ে উঠলেও গত তিন বছর ধরে এখানে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ। মিলছে না সরকারি কোনো আর্থিক সুবিধা। পার্কের ভেতরে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ ও মাদক সেবনের ঘটনায় ভেঙে পড়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থাও। উদ্যোক্তাদের দাবি, আটকে আছে তাদের ভাড়া নবায়ন চুক্তিও।
এ বিষয়ে উদ্যোক্তা উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ‘এখানে কাজের পরিবেশ নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা সেন্ট্রাল এসি অকেজো। এসি না থাকায় গরমের মধ্যে কাজ করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কর্মীরা অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ক্লায়েন্টদের সার্ভিস দিতে পারছি না। কাজ কমে যাওয়ায় কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষ কর্মী তৈরিতে সরকারি প্রজেক্ট ছিল, তাও বন্ধ। এখন আমরা কর্মী সংকটের মধ্যে আছি। ওই প্রজেক্টগুলো থাকলে আমরা যেমন উপকৃত হতাম, তেমনি অনেক দরিদ্র ছেলেমেয়ে স্বাবলম্বী হতে পারত।’
উদ্যোক্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিগত সরকারের পতনের পর হাইটেক পার্কের সাথে নতুনভাবে চুক্তি হওয়ার কথা। আমাদের প্রত্যাশা ছিল চুক্তিটি যেন দ্রুত হয়। কিন্তু এ বিষয়ে হাইটেক পার্কের কোনো উদ্যোগ বা তদারকি নেই। পার্কের নিরাপত্তায় এমন একটি সিকিউরিটি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যারা ঠিকমতো কাজ করছে না। বহিরাগতরা এসে এখানে মাদক সেবন করে। আমরা হাতেনাতে ধরে দেয়ার পরও কর্তৃপক্ষ কোনো অ্যাকশন নিচ্ছে না।’
বিদ্যুৎ বিলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ৫০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল দিয়েছি। এখনও পর্যন্ত তিনটা জেনারেটরের দুইটা জেনারেটর নষ্ট। বিদ্যুৎ চলে গেলে হয় এসি বন্ধ থাকে, তা না হলে লিফট বন্ধ থাকে। আমরা এখানে এসেছি প্লাগ অ্যান্ড প্লে সার্ভিসের জন্য। কিন্তু এই ধরনের কোনো সুবিধাই এখনও পর্যন্ত হাইটেক পার্ক দিতে পারেনি। আগে আমার স্টাফ ছিল ২৮-৩০ জন, এখন সেখানে চলে এসেছে সাত-আট জন। সব মিলিয়ে আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছি।’
আরেক উদ্যোক্তা অজয় দত্ত বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে আমরা টোটালি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছি এবং এই বিল্ডিংয়ের কোনো রক্ষণাবেক্ষণ নেই। দীর্ঘ দুই বছর ধরে এসি বন্ধ। যার কারণে আমাদের কর্মীরা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। একই সাথে আমাদের নিরাপত্তার কোনো বালাই নেই। কখন কে আসছে, কখন কে যাচ্ছে কোনো তদারকি নেই। যার কারণে এখানে কর্মরত মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আশা, নতুন সরকার যশোর আইটি পার্কের ওপরে বিশেষ নজর দেবে, স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখবে এবং আগামী কয়েক বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা করবে যে যশোর আইটি পার্ককে কীভাবে উন্নতি করা যায়।’
সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন যশোরের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার শাহজালাল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল পার্ক হচ্ছে এটা। কিন্তু এখানে বেশ কিছু পলিসিগত ও প্রশাসনিক সমস্যা আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নতুন করে চুক্তির সিদ্ধান্ত হলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা হচ্ছে না। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, অথরিটি এটাকে একটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মতো চিন্তা করছে। অথরিটিকে এটাকে ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশনাল এজেন্সি হিসেবে ভাবতে হবে। আইটি খাতের দিকে সরকার নজর না দিলে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এগোতে পারব না।’
অবশ্য এ পার্কের উপ-পরিচালক মো. মাহফুজুল কবীর বলেন, ‘আমরা সকল সমস্যা চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে এনেছি এবং সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আশা করি ভালো কিছু হবে।’
প্রসঙ্গগত, ২০১৭ সালে প্রায় ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই পার্কে বর্তমানে ৬১টি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। যার মধ্যে ৪৬টি চলমান। এছাড়া বিনিয়োগকারী না মেলায় ২৮ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা খালি পড়ে আছে।










































