নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেছে অনেক আগেই। দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ভাতা, শিক্ষা সহায়তা ও প্রশিক্ষণও। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি,স্থায়ী বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক সম্পত্তিতে অধিকার ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগের জালে আটকে আছে হিজড়া জনগোষ্ঠী। ফলে অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলস্রোতে ফেরাতে সরকারি- বেসরকারি উদ্যোগগুলো কার্যকর হচ্ছেনা।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শিশুকাল অবস্থা থেকে সমাজের মানুষ হিসেবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতসহ প্রতিবন্ধকতাগুলো দুর করতে পারলে তারা জনসম্পদ হয়ে উঠতে পারে। এজন্য বাস্তবসম্মত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরী।
অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সদস্য শিল্পী হিজড়া, যিনি (গুরুমা) আরো ৩০-৩৫ জন হিজড়াকে পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, আমাদের কষ্টের কথা কেউ শুনতে চাননা। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু তা খুব কাজে আসেনা। কেউ আনন্দ নিয়ে পরিবার বা ঘর ছাড়ে না। হিজড়াদের স্থায়ী আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে সুযোগ নেই। কেউই আমাদের কাজ দিতে চান না। আবাসন নেই, কেউ ঘর ভাড়াও দিতে চান না। এখনো বাচ্চা নাচিয়ে পেট চালাতে হয়। এটি অমানবিক। জটিল অসুখে পড়লেও চিকিৎসা ব্যয় মিটানোর ব্যবস্থা নেই।
হিজড়া জনগোষ্ঠীদের নিয়ে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন নক্ষত্র যুব মানবকল্যাণ সংস্থার সভাপতি পাখি দত্ত। যিনি জেলা পর্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জয়িতা। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিললেও হিজড়া জনগোষ্ঠী এখনও পর্যন্ত সমাজের চোখে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আর দশজন সাধারণ মানুষের মত সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। তারা পিছিয়ে পড়া নয়, পিছিয়ে রাখা হয়েছে। তবে ভোটার তালিকায় নিজের পরিচয়ে পরিচিতি আশাব্যাঞ্জক। আমরা আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিকদলগুলোর কাছে সুনিদিষ্ট প্রতিশ্রুতি চাই। কোন শিশু প্রতিবন্ধী হলে সমাজ বা পরিবার তাদের বের করে দেন না। কেউ কটু কথাও বলেন না। অথচ কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও হিজড়া শিশুদের ঘরে আশ্রয় নেই। দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, তাহলেএই জনগোষ্ঠীও নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাবে।
নিজেদের দুরব্যস্থার কথা তুলে ধরে গুরুমা সিমলা হিজড়া বলেন, দৌলতপুর, খালিশপুর ও কালিয়ার প্রায় ৮০-৯০ হিজড়া নিয়ে কাজ করছি। আমাদের অবস্থা দিন খারাপ হচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। মানুষের আয়ও কমছে। রেলের জমিতে থাকছি। এটি কষ্টের জীবন। শুধু স্বীকৃতিই সমস্যার সমাধান নয়। আমরা সমাজের মাথা তুলে দাঁড়াতে চাই।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীর মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে লিঙ্গ পরিচয় হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য একটি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি, সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতির ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় নারী ও পুরুষের পাশাপাশি ‘হিজড়া’ শব্দটিও অন্তর্ভুক্ত করে।
খুলনা জেলা নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটার তালিকায় খুলনার ৬টি আসনে ২৯ হিজড়া ভোটার হয়েছেন। দ্বাদশ সংসদে হিজড়া এ সংখ্যা ছিল ১৪ জন। সেই হিসাবে হিজড়া ভোটার বেড়েছে ১৫ জন। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে হিজড়া জনগোষ্ঠীর কেউ ভোটার হিসেবে সনাক্ত হননি। খুলনায় এবারের মোট ভোটার ২০ লাখ ৭৯ হাজার ১১০ জন। অবশ্য হিজড়া জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বিভিন্ন দপ্তরে পার্থক্য রয়েছে। ২০১৩ সালের বেসরকারি সংস্থা লোসাউকের জরিপ অনুযায়ী খুলনা বিভাগে হিজড়ার সংখ্যা ছিল ৫৯৩ জন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয়ের তথ্য মতে, মহানগরী ও খুলনার ৯টি উপজেলায় ২১২জন হিজড়া রয়েছেন।এরমধ্যে সদরে ২৫জন, সোনাডাঙায় ২২ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৭ জন। এই হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা প্রতিমাসে ৬০০টাকা করে ভাতা পান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০টাকা। হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করতে সেলাই মেশিন, বিউটিফিকেশন, ব্লক-বুটিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ২৯৫ জন। কেউ কেউ একাধিক বিষয়েও প্রশিক্ষণ নেন। তবে খুলনায় হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৪ স্তরে (প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চতর স্তর) উপবৃত্তি প্রদান কর্মসূচির জন্য কেউ আবেদন করেননি।
খুলনা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক কানিজ মোস্তফা বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ১০ বছর পেরিয়েছে। এক সময়ে এ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কুসংস্কার, অপপ্রচার ও নানাভাবে হয়রানি করা হতো। সেই অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। একজন হিজড়া শিশুকে সাধারণ শিশুর মতো পরিবারে লালন-পালন করে গড়ে তোলার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। সরকার তাদের কর্মক্ষম করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তাই তাদের কর্মসংস্থান প্রদান, পরিবারসহ সর্বক্ষেত্রে মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। যা হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলস্রোতধারায় ফিরিয়ে আনবে।
হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ছিন্নমূল মানব কল্যাণ সোসাইটির প্রধান নির্বাহী মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘আমরা সর্ব প্রথম হিজড়া জনগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করেছিলাম। তারা মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও আবহমান কাল থেকে এ জনগোষ্ঠী অবহেলিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। সমাজে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার এ জনগোষ্ঠীর পারিবারিক, আর্থসামাজিক, শিক্ষা ব্যবস্থা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা কেন তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি। স্বাভাবিক শিশুর মতো তাদের গড়ে তুলতে পারলে তারা সমাজে বড় অবদান রাখতে পারবেন। তাই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে।
উল্লেখ্য, আর্থিক বৈষম্য, নিরাপত্তাক্রিশ্চিয়ান এইড, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সম্মিলিতভাবে Expanding civic space through active CSO participation and strengthened governance system in Bangladesh (ECSAP) নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক নারী, দলিত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ট্রান্সজেন্ডার, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।











































