বিনোদন ডেস্ক।।
লায়লা বাউল। ফরিদপুর শহরের বাসিন্দারা তাঁকে এ নামেই চেনেন। একজন সংসারত্যাগী ভবঘুরে মানুষ। শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত– শ্মশান ঘাট, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন ও হাটবাজার। অর্থাৎ যেখানে লোকসমাগম, সেখানেই ষাটোর্ধ্ব এ নারীকে দেখা যায়। হঠাৎ তাঁর প্রসঙ্গ এলো কেন?
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুরে একটি অনুষ্ঠানে নজরুলগীতি গেয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তোলেন লায়লা। কবির ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার, আঁচল ভরা ফুল’ গানটি দ্রুত হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এ গান গেয়ে শিল্পী লায়লা কেবল শ্রোতাকেই মুগ্ধ করেন না, সুরের অন্তহীন ইন্দ্রজালে আটকে ফেলেন।
গত শনিবার বিকেলে শহরের ময়েজ মঞ্জিলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ। অনুষ্ঠানে খালি কণ্ঠে নজরুলগীতি পরিবেশন করে রাতারাতি ব্যাপক পরিচিতি পান লায়লা বাউল। স্থানীয় ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার অপূর্ব অসীম অপু লায়লা বাউলের গান মাঝে মাঝে ভিডিও করে আপলোড করেন তাঁর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে। সমকালকে তিনি বলেন, ‘পথে-ঘাটে যখনই লায়লা বাউলকে পাই, তাঁর একটা গান রেকর্ড করে আপলোড করি। ছয় বছর আগে অল্প দিনের ব্যবধানে লায়লা বাউলের ১০-১২টি গান আপলোড করি, তখন সেগুলো বেশ ভিউ পেয়েছিল। ছয় বছর পর আবার নজরুলজয়ন্তীতে লায়লা বাউল খালি গলায় গান গেয়ে ভাইরাল হলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যতদূর জানি– তাঁর নিজস্ব কোনো ঠিকানা নেই। চাইলেই লায়লা বাউলকে খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকে তাঁকে না বুঝে পাগল বলে। আসলে তিনি লালন ভক্ত বাউল; সাধু সঙ্গে চলতে পছন্দ করেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোহেমিয়ান লায়লার বিচরণক্ষেত্র একসময় ছিল ফরিদপুর শহরের রথখোলা এলাকায়। কৈশোরে তাঁর বিয়ে হয়েছিল ওই এলাকায়।
সোমবার সন্ধ্যায় সরেজমিন রথখোলা এলাকায় গিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে লায়লার জীবন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর বর্তমান বয়স আনুমানিক ৬৫ বছর। শৈশবে এলাকার ‘দিলীপের মা’ নামে পরিচিত এক নারীর সান্নিধ্যে আসেন বাবা-মা বিচ্ছিন্ন লায়লা। ওই নারী তাঁকে কৈশোরে বিয়ে দেন ইসলাম শেখ নামের এক যুবকের সঙ্গে। ৯ বছর আগে সেই ইসলাম শেখ মারা যান। লায়লার দুই ছেলে দুই মেয়ে। দুই ছেলে আবুত মনা ও টুটুল শেখ বর্তমানে ফরিদপুর শহরতলির হারোকান্দি এলাকায় থাকেন।
টুটুল বলেন, ‘মাগান পাগল মানুষ; মাঝে মাঝে কোথায় চলে যান, আবার ফিরে আসেন। যাওয়ার সময় আমাদের বলে যান না। কিন্তু একাই আবার ফিরে আসেন। বিভিন্ন বাউলের আসর ও গানের অনুষ্ঠানে তিনি ঘুরে বেড়ান। নিজে গান করেন। তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না।’ টুটুল আরও বলেন, ‘গান গাওয়াই তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। চাইলেই আমরা তাঁকে আটকে রাখতে পারি না। স্বাধীনভাবে ঘুরে গান গেয়ে তিনি ভালো থাকেন।’
স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই গান গাওয়ার অভ্যাস লায়লার। নিজে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে পারেন তিনি। নজরুলগীতি, লালনগীতিসহ দেশের বিভিন্ন গান তিনি গেয়ে থাকেন।
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, ‘আরও ২০ বছর আগে লায়লার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলাম। শিল্পকলা একাডেমিতে যেখানে গানের চর্চা হতো, সেখানে তাঁকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখতাম। ভবঘুরে জীবন নিয়ে লায়লা সব সময় বলেন– আমি মানুষ দেখি, দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ!’











































