Home আলোচিত সংবাদ সুন্দরবনের প্রাণ সুন্দরীগাছ বাঁচাতে এখনই পদক্ষেপ জরুরি

সুন্দরবনের প্রাণ সুন্দরীগাছ বাঁচাতে এখনই পদক্ষেপ জরুরি

17


সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, বাংলাদেশের গর্ব ও প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। এই বনের প্রাণ, এর নামের উৎস ‘সুন্দরীগাছ’ আজ এক ভয়াবহ সংকটে। পাঁচ-ছয় বছর আগেও যেখানে ঘন সুন্দরী বনে পাখির কূজন শোনা যেত, আজ সেখানে শুকনো কাণ্ড, মরা শাখা আর পরগাছার আক্রমণে জীর্ণ গাছের সারি। বনজীবী থেকে শুরু করে বন বিভাগের কর্মকর্তারাও এখন একমত-সুন্দরীগাছ মারাত্মকভাবে পরগাছার কবলে পড়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরীগাছ ইতিমধ্যেই পরগাছায় আক্রান্ত। এই উদ্ভিদ পোষক গাছের গায়ে জন্ম নিয়ে তার থেকেই পুষ্টি শোষণ করে বেঁচে থাকে। ফলে গাছের বৃদ্ধি রুদ্ধ হয়, ফলন ও বীজ দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং একসময় গাছ মারা যায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘মিসলটো’ নামের একধরনের পরগাছা হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তবে আরও এক ধরনের ফার্নও সুন্দরীগাছে জন্ম নিচ্ছে, যা পুষ্টি শোষণ না করলেও গাছের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এই সমস্যা শুধু একটি জৈবিক পরজীবীর আক্রমণ নয়; এটি একটি গভীর পরিবেশগত সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরীগাছ দুর্বল হয়ে পড়েছে লবণাক্ততার বাড়তি চাপে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের জলবায়ু ও মাটির প্রকৃতি বদলে গেছে। মিষ্টি পানির ঘাটতি গাছের বৃদ্ধি কমিয়ে দিয়েছে, ফলে তারা সহজেই পরগাছার আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
সুন্দরবনের এই সংকট শুধু একটি প্রজাতির নয়; এটি গোটা ইকোসিস্টেমের জন্য হুমকি। সুন্দরীগাছ কমে গেলে বনটির ভারসাম্য নষ্ট হবে, হুমকিতে পড়বে বাঘ, হরিণ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী। সুতরাং এখনই সময়-বিজ্ঞানভিত্তিক জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার। ১. প্রথমত, বন গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ উদ্যোগে পরগাছার প্রজাতি ও বিস্তারের ওপর বিস্তারিত গবেষণা শুরু করতে হবে। ২. দ্বিতীয়ত, শীত মৌসুমের আগে পরগাছা অপসারণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার, যাতে এর বংশবিস্তার রোধ করা যায়। ৩. তৃতীয়ত, উজান থেকে পশুর ও বলেশ্বর নদে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানোর জন্য দুই দেশের (বাংলাদেশ-ভারত) মধ্যে নতুন জলচুক্তি আলোচনায় আনতে হবে। ৪. চতুর্থত, লবণাক্ততা হ্রাস ও বন পুনরুজ্জীবনের জন্য স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট’ কার্যক্রম শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ভারতীয় গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের পানিতে এখন ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জিন’ বা ‘সুপারবাগ’ বাড়ছে, যা শুধু প্রাণীকূল নয়, উদ্ভিদ ও ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যও নষ্ট করছে। এই হুমকি মোকাবিলায় দ্বিপাক্ষিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জিনোম বিশ্লেষণ অপরিহার্য। সুন্দরবন শুধু গাছ বা প্রাণীর আবাস নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলকে রক্ষা করে এমন এক প্রাকৃতিক ঢাল। তাই সুন্দরীগাছের মৃত্যু মানে সুন্দরবনের মৃত্যু-আর সুন্দরবনের মৃত্যু মানে উপকূলীয় বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট। এখনই সময়, গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব উদ্যোগের মাধ্যমে সুন্দরীগাছ বাঁচাতে একযোগে কাজ করার। বিলম্ব মানেই বিপর্যয়।