Home জাতীয় গণফোরামের দুইপক্ষ মুখোমুখি

গণফোরামের দুইপক্ষ মুখোমুখি

8

ঢাকা অফিস

অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এবার বিভক্তি হয়ে পড়েছে গণফোরাম। কেন্দ্রীয় কমিটিকে ভেঙে দেওয়ার পরও গৃহবিবাদ থেকে বেরুতে পারছে না দলটি। পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার আর দুইপক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যেই এবার বিক্ষুব্ধরা পৃথক বর্ধিত সভার আয়োজন করছে। এতে নতুন করে কোন্দলের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।  বিক্ষুব্ধরা বলছেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালনা হচ্ছে না। তাই দলকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে যেতে চাইছি। অন্যদিকে এই সভাকে অগঠনতান্ত্রিক বলে দাবি করেছেন গণফোরাম কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের অভ্যন্তরে অস্থিরতা আর বিশৃঙ্খলায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ দলটির প্রতিষ্ঠাতা ড. কামাল হোসেন শেষ পর্যন্ত গত মার্চের শুরুতে কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে গঠন করেন সত্তর সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি। এ কমিটিতেও ড. কামাল হোসেন সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া রয়েছেন। এছাড়া অন্য সবাইকে সদস্য করা হয়েছে। পরে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এই আহ্বায়ক কমিটিকে আর পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি নেতারা। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতারা। দলকে চাঙ্গা করতে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়ে এবার নতুন কৌশলে এগুতে চাইছেন তারা। এর অংশ হিসেবে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস কাবে বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে। এই বর্ধিত সভার সঙ্গে রয়েছেন গত কমিটির কার্যনির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুর মতো সিনিয়র নেতারা।

তবে গণফোরামের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই সভার সঙ্গে গণফোরামের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। দলটির সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেউ এরকম বর্ধিত সভা আহ্বান করতে পারেন না। এটা সম্পূর্ণভাবে গঠনতন্ত্রবিরোধী কাজ। যে কারো রাজনীতি করার অধিকার আছে। কিন্তু গণফোরামের নাম ব্যবহার করে কোনো সভা করার অধিকার কারো নেই। কথিত ওই সভায় গণফোরামের কোনো জেলা কমিটির নেতারা আসবেন না। প্রত্যেকটা জেলা কমিটি নেতাদের সাথে কথা হয়েছে। জেলার নেতারা জানিয়েছেন- তারা ওই সভায় যাবেন না।

ড. রেজা কিবরিয়ার এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ড. রেজা কিবরিয়া নিজেই তো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দল পরিচালনা করছেন না। গঠনতন্ত্রের আছে ৩০ দিনে সম্পাদক পরিষদ, ৬০ দিনে স্থায়ী কমিটি এবং ৯০ দিনে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক করতে হবে। ১০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার এক বছরের মধ্যে একটি বৈঠকও করা হয়নি। এসব বৈঠক আহ্বান করার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির ৭০ জন সদস্য লিখিতভাবে চিঠি দিয়েছে। উল্টো তাদের মধ্যে ১৩ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং চার জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এভাবে তো দল চলতে পারে না। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। চরম স্বেচ্ছাচারিতা চলছে।

বর্ধিত সভা আহ্বানকারী অংশের নেতারা জানান, এই অনুষ্ঠানে ড. রেজা কিবরিয়া বাদে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সারাদেশের জেলা-উপজেলা থেকে প্রতিনিধিদের আসতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি না এলে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মকৌশল ঠিক করা হবে।

বিক্ষুব্ধরা বলেন, আমরা রাজনীতি করতে চাই, রাজনীতির স্বাভাবিক চর্চার অধিকার চাই। গণফোরাম গঠনের সময়ই বলা হয়েছিলো, সবকিছু স্বচ্ছতার আলোকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করা হবে। সেজন্য এই দলের সভাপতির একচ্ছত্র ক্ষমতা নেই, যা অন্যান্য দলে আছে। সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের শেষ দিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে তৎপর হয়ে ওঠেন নেতারা। কেউ এর পক্ষে আবার কেউ বিপক্ষে অবস্থান নেন। কট্টরপন্থীরা বিএনপির সঙ্গে কোনো ঐক্য না গড়তে চেষ্টা করেন। অপরদিকে অপেক্ষাকৃত উদারমনা নেতারা বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য গড়ার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। এর বাইরে বিশেষ কাউন্সিলে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাতীয় সংসদে শপথ নেওয়ার পরও দলে মোকাব্বির খানের উপস্থিতি নিয়ে সরব হয়ে ওঠেন অনেকে। এর জের ধরে দলের প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পথিককে বহিষ্কার করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলের একটি বৃহৎ অংশ। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন অনেক সক্রিয় নেতা।

নির্বাচনের আগে দলে যোগ দেওয়া ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক এবং অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে নির্বাহী সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়। এতে দলের নতুন আরেকটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ক্ষুব্ধ নেতারা রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে থাকেন। বিভক্ত উদারমনা একটি অংশের সঙ্গে কট্টরপন্থী নেতারা যোগসাজশ করে আরেকটি বৃহৎ বলয় গঠনের উদ্যোগ নেন। এই দুই অংশের মধ্যেই চলছে এখন কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনা। দলের একটি অংশের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, মূলত সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়াকে কোনঠাসা করতেই শুরু থেকে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। রেজা কিবরিয়ার গ্রহনযোগ্যতা আর পরিচিতি নিয়ে দলের একটি অংশের শঙ্কা রয়েছে। তারা মনে করছেন, দীর্ঘকালের জন্য দলের নেতৃত্ব তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।

আবার অপর একটি অংশ বলছেন, দলের সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় কমিটির সভা আহ্বান করার অনুরোধ করলেও তিনি দলের অফিসে হাজির না হয়ে মাসের পর মাস বিদেশে অবস্থান করে অফিসের বাইরে উপদলীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংগঠনকে শক্তিশালী করতে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকাই রাখেননি। এভাবে এখন বহুধা বিভক্তির কবলে গণফোরাম। আর বাড়ছে কোন্দল। যা প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে ওই বর্ধিতসভাকে কেন্দ্র করে।