সৈয়দ রানা কবীর
নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ইন্ধনে খুলনায় ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বেশকয়েকটি কিশোর গ্যাং। নগরীতে অরাজকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নেপথ্যে থেকে সংগঠনটি এমন ষড়যন্ত্র করছে। সব ধরণের শেল্টার পেয়ে দিনে-রাতে অস্ত্র হাতে মহড়া, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তি সামর্থ্য জানান দিচ্ছে গ্যাংগুলো।
গত প্রায় ৭ মাসে ধারালো অস্ত্রায়াত, ছুরিকাঘাত, কুপিয়ে ও আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে গুলি করে প্রায় ২০ জনকে হত্যাসহ অর্ধশত জনকে গুরুতর জখম করেছে সন্ত্রাসীরা।
কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মাঝে তাদের সক্রিয় হয়ে উঠা নিয়ে নগরীতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীসহ জেলার প্রধান সমস্যা মাদক ও কিশোর গ্যাং। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ দুটি সমস্যা নিয়ে নিয়মিত অভিযান চালিয়েও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। ইতোপূর্বে যৌথবাহিনীর তৎপরতায় খুলনার কিশোর গ্যাংগুলো কিছুটা নিস্ক্রীয় থাকলেও সম্প্রতি তারা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
খুলনা মহানগরীর ও জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে এলাকায় আতংক সৃষ্টি করছে বলে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাঝে মধ্যে তাদের অবস্থান জানান দিতে মিছিলও করেছে তারা। এতে নগরীসহ সমগ্র খুলনাবাসীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সূত্র জানায়, শুধু নগরীতে অরাজকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বেশকয়েকটি কিশোর গ্যাং চক্রকে ব্যবহার করছে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ। অজ্ঞাত স্থানে বসে এ সংগঠনের নেতারা কিশোর গ্যাংগুলোকে অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করছে বলেও একাধিক সুত্রের অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিযোগ করেন, নগরীসহ সমগ্র খুলনায় এক্স, সুজনস, হর্স বয়, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, ফ্লাইং মোড, টাইগারসহ বিভিন্ন নামে বেশ কিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয়। তবে সেই তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকরী তেমন কোন তৎপরতা বা কোন পদক্ষেপ নেই বলেও সাধারণ মানুষের অভিযোগ রয়েছে।
এতে করে নগরীসহ সমগ্র খুলনায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের নিয়ে এখন চরম ভাবে উদ্বিগ্ন ও আতংকিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আতঙ্কে আছেন অভিভাবকরা।
খুলনার বয়রা এলাকায় গত বুধবার সন্ধ্যায় মো: আব্দুর রহিম(২২) নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা।
গুরুতর জখম আব্দুর রহিম সোনাডাঙ্গা থানার আদর্শ পল্লী এলাকার বাসিন্দা মো: শহিদুল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, বুধবার সন্ধ্যায় ৩/৪ জন কিশোর ও যুবক অতর্কিতভাবে একটি ফলের দোকানে দাঁড়ানো অবস্থায় রহিমকে তার মাথায় ও দুই পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়।
গত শনিবার সদর থানার টিবি বাউন্ডারি রোড এলাকায় এক যুবককে রাত ১১ টায় কয়েকজন যুবক ছুরিকাঘাত করে তার পায়ের রগ কেটে দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়াও গত প্রায় ৭ মাসে ধারালো অস্ত্রের দ্বারা ছুরিকাঘাত, কুপিয়ে ও আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে গুলি করে প্রায় ২০ জনকে হত্যাসহ অর্ধ শতজনকে গুরুতর জখম করেছে এ সকল অপরাধীরা।
এদিকে গত ৭ মাসে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গ্যাংগুলো মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংয়ের মতো নানা রকম অপরাধের সাথে জড়িত রয়েছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতারা নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামের মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। খুলনা, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, দৌলতপুর, হরিণটানা, আড়ংঘাটা, খানজাহান আলী, লবনচরা, রূপসা, দিঘলিয়া, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা,পাইকগাছা থানা এলাকায় এদের তৎপরতা বেশী।
সুত্র জানায়, এসব বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের জানানো হলেও তারা কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে এ ধরণের অপরাধ প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিশোর গ্যাংগুলো মাঝে মধ্যে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। এতে অনেক অভিভাবকরা এখন তাদের মেয়ে সন্তানদেরও স্কুলে পাঠানো এবং তার নিরাপত্তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
খুলনা মহানগর ছাত্রদলের তাজিন বিশ্বসাস বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতারা অজ্ঞাত স্থানে বসে অর্থ এবং অস্ত্র সরবরাহ করে বেশকয়েকটি কিশোর গ্যাংকে সক্রিয় করেছে। নানা সোর্সের মাধ্যমে আমরা এসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি। নগরীসহ সমগ্র খুলনায় অরাজকতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ছাত্রলীগ এমন অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ দমনে আমরা মাঠে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। এসব অপরাধীদেরকে প্রশ্রয় নয়, যথাযথভাবে দমন করতে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে মহানগর ছাত্রদল।
ছাত্রদলের খুলনা সদর থানার সদস্য সচিব সালাম জানান, সমাজে যারা অরাজকতা সৃষ্টির পায়তারা করছে তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা সজাগ রয়েছে। তাদের পতিহত করা হবে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অনেকে পরিচয় গোপন করে কিশোর গ্যাং এর সাথে জড়িয়ে সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বর্তমানে উদাসীন রয়েছেন। পুলিশের অনেকে এখনো পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের নিয়োগ পাওয়া দলীয় নেতা, কর্মী ও তাদের অনুসারীরা রয়েছে। তাদের কারনে খুলনা অশান্ত করতে পায়তারা চালাচ্ছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুলনার উপদেষ্টা মিনহাজুল আবেদিন বলেন, একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মাঠে নামার পাঁয়তারা করছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। তারা কিশোর গ্যাংগুলোকে ব্যবহার করছে। মূলত জনসাধারণের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে তারা মাঠে আসার চেষ্টা করছে। আমরা ছাত্রলীগের এমন অপতৎপরতাকে কঠোর হস্তে রুখে দেব। স্বৈরাচারী পলাতক হাসিনার বড় অস্ত্র হচ্ছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। তারা সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিতে এই কিশোর গ্যাং এর সদস্যদের ব্যবহার করছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ তারা এখন আবারো নতুন করে সমাজকে অশান্ত করতে আত্মগোপনে থেকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে কিশোর গ্যাংসহ অন্য অপরাধীদের ব্যবহার করছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার মো: আবু তারেক বলেন, নগরীতে যেসব কিশোর গ্যাং অস্ত্রের মহড়া দিয়ে মিছিল করেছে, আমরা তাদের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করছি। এরই মাঝে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিয়মিত নগরীর বিভিন্ন থানায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিশোর গ্যাংগুলো হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার নেপথ্যে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ইন্ধন থাকতে পারে। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছি। খুলনায় শান্তি শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে কেএমপি কমিশনারের নির্দেশ সব থানায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।











































