Home Lead চার যুগের আলোচিত খুলনার ‘শেখ বাড়ি’র অবসান

চার যুগের আলোচিত খুলনার ‘শেখ বাড়ি’র অবসান

73


সৈয়দ রানা কবীর
।।
পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচার বহুল আলোচিত খুলনার ‘‘শেখ বাড়ি’ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুদ্ধ ও উত্তেজিত ছাত্র-জনতা। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একটি ফেসবুক পেজে শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করে বাড়িটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষুদ্ধ ছাত্র -জনতা একে একে শেখ হাসিনার দিঘলিয়ার রেস্ট হাউজ, খুবি’র ও বিএল কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের মুর্তি ভাঙচুর করেছে। অবশেষে দীর্ঘ প্রায় চার যুগের আলোচিত খুলনার শেখ বাড়ির অবসান ঘটলো।


৫ ফেব্রুয়ারি রাত একটি মিছিল সহকারে শতাধিক ছাত্র -জনতা নগরীর শেরে বাংলা রোডস্থ ‘শেখ বাড়ি’র সামনে পৌঁছায়। সেখানে এসেই উত্তেজিত ছাত্র জনতা ভাঙচুর শুরু করে শেরেবাংলা রোডের বহুল আলোচিত শেখ পরিবারের সদস্যদের ও শেখ হাসিনার চাচার শেখ বাড়িটি। পরে একে একে দুটি বুলডোজার এনে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি শেখ হাসিনার চাচা শেখ আবু নাসেরের ‘শেখ বাড়ি’ নামে পরিচিত এই বাড়িটি। রাতভর বাড়িটি ভাংগার কাজ চলতে থাকে। বাড়িটি ভাঙার সময় শুরু থেকে রাতভর হাজার হাজার উৎসুক নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ছাত্র -জনতা উপস্থিত ছিলো। এসময় শেরেবাংলা রোডে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকতে দেখা যায়।


এই ঘটনার খবর পেয়ে খুলনার ও জাতীয় সকল সংবাদকর্মীরা তাদের সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তোলা ও ভিডিওর কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
জানাযায়, আলোচিত এই শেখ বাড়িটির সামনের অংশটি খুলনার আলোচিত সমালোচিত ও শেখ পরিবারের আশির বাদ পুষ্ট ব্যবসায়ী উপঢৌকন হিসাবে তৈরী করে দেয়। সেখানে সুদর্শন একটি ঝুল বারান্দা করা হয়।
খুলনার আলোচিত এই শেখ বাড়িটির সামনের ঝুল বারান্দাটি তৈরী করে দেন খুলনার মাহবুব ব্রাদাস। শেখ পরিবারের সদস্যদের খুশি করতে মাহবুব ব্রাদাস এর কর্ণধার ২০১৮ সাল পরবর্তীতে শেখ বাড়ির সামনের গেট থেকে শুরু করে এই ঝুল বারান্দাটি করে দেন। জানাযায়, এটি শেখ পরিবারের সদস্যদের খুশি করতেই এই উপহার দেয়া হয়। এরই বিনিময়ে মাহাবুব ব্রাদার্স সমগ্র বিভাগ জুড়ে শত শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয় বলে জানাগেছে।


আর এই ঝুল বারান্দায় দাড়িয়ে শেখ পরিবারের সদস্যরা তখন থেকে হাত নাড়িয়ে শুভেচছা জানাতো নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে। তবে সেই দৃশ্য দেখে যেন মনে হতো রোমান রাজাদের মতো প্রজাদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
অথচ দীর্ঘ কয়েক যুগের আলোচিত খুলনার সেই শেখ বাড়িটি ৫ ফেব্রুয়ারী রাতে বিক্ষুব্ধ ছাত্র -জনতা মাত্র কয়েক ঘন্টায় ভেঙে গুড়িয়ে নিমিষেই মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। আর এই ঘটনার পর দীর্ঘ কয়েক যুগের আলোচিত শেখ বাড়িটি নিমিষেই মাটির সাথে মিশিয়ে দপয়া হলো। এই দৃশ্য অবলোকন করতে খুলনার উৎসুক নারী, পুরুষ, বৃদ্ধসহ হাজার হাজার মানুষের উপচেপড়া ভীড় করেন। শেখ বাড়িটি ভেঙেফেলার সময় অনেকে শেখ হাসিনা, শেখ পরিবারসহ তাদের সদস্যদের নামে নানা কুরুচিপূর্ণ মুর্হূমহু শ্লোগান দিতে থাকে।


সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় শেখ বাড়ির সামনে নগরীর বিভিন্ন থানা এলাকার রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীরা শেরেবাংলা রোডে মিছিল করে। তারা শেখ পরিবারের সদস্যদের বিচারের দাবিতে নানা ধরনের শ্লোগান দেয়।
এই আলোচিত শেখ বাড়িতে বসবাস করতেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই বাগেরহাট-০১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দীন, খুলনা-০২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ সোহেল, শেখ রুবেল ও শেখ বাবু এবং শেখ হাসিনার ভাইপো বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ সারহান নাসের তন্ময় বসবাস করতেন।
সোনাডাঙ্গা থানার বানরগাতির মো: ইসলাম বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর যাবত এই বাড়ি থেকে খুলনার ততকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও কর্মীদের নামে বিভিন্ন মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের নির্দেশ দেয়া হতো। এক যুগ নানা রকম দখল, সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার বানিজ্যের নিয়ন্ত্রণ করা হতো।হেনো কোন অপকর্ম নেই যা এই বাড়ির সদস্যরা করতো না।
উৎসুক অনেকে বলেন, খুলনাবাসীর কাছে এই আলোচিত শেখ বাড়িটি ছিলো একটা মুর্তিমান আতংক। অনেকে সাহস করে এই বাড়ির সামনে চলাফেরা করতেও ভয় পেতেন।


অভিযোগ রয়েছে, খুলনার এই বাড়ি থেকে খুলনাসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের আওয়ামী লীগের রাজনীতিসহ বিভিন্ন সরকারি টেন্ডার, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় প্রভাব বিস্তার করে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। গত ৪ ও ৫ আগস্ট প্রথম দফায় একবার বাউন্ডারিসহ কিছু অংশ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে বিক্ষুদ্ধ জনতা। অবশেষে গত ৫ ফেব্রুয়ারি খুলনার আলোচিত এই শেখ বাড়িটি সম্পূর্ণ ভেঙে গুড়িয়ে দিলো ছাত্র -জনতা ও বিক্ষুদ্ধ মানুষ। অবশেষে অবসান ঘটলো দীর্ঘ প্রায় চার যুগের আলোচিত খুলনার শেখ বাড়ির।