বাগেরহাট প্রতিনিধি
একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত খালিদ হাসান। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকেন বাগেরহাট শহরের সোনাতলা এলাকায়। গতকাল সোমবার সকালে শহরের প্রধান কাঁচাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এসেছিলেন। তবে শাকসবজিসহ সব পণ্যের অস্বাভাবিক দাম দেখে যেন মাথা ঘুরতে থাকে তাঁর। এ জন্য বাজারের ব্যাগ হাতে এ দোকান থেকে ও দোকানে ঘুরছিলেন। আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই খরচের হিসাব মেলাতে পারছিলেন না।
১৫ দিন আগে-পরের তুলনা করে খালিদ হাসান বলেন, ‘কাঁচামরিচ ও সবজির দাম কিছুটা সহনীয় ছিল। চলতি সপ্তাহে সব কিছুর দামই অনেক বেড়েছে। ২০০ গ্রাম কাঁচামরিচ কিনেছি ১৪০ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে কীভাবে বেঁচে থাকব আমরা?’
ওই বেসরকারি চাকুরের কথার সত্যতা মেলে বাগেরহাটের বিভিন্ন বাজারে। সব বাজারেই বেড়েছে সবজি, মসলা, মাছ, চালসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। সবকিছু ছাপিয়ে গেছে কাঁচামরিচ। সোমবার সকালে বাগেরহাটের বড়বাজারে কেজিপ্রতি কাঁচামরিচ বিক্রি হয় ৬০০ টাকায়। বেড়েছে অন্যান্য সবজির দামও। ৫৫ টাকার আলু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়, ৩০ টাকার মিষ্টিকুমড়া পৌঁছেছে ৬০ টাকায়। ৪০ টাকার শশা ৬০-৭০ টাকায়, করলা ৮০ টাকায়, ৭০ টাকার বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৫০ টাকায়। টমেটো এদিন বিক্রি হয় ২৬০ টাকায়। পেঁপের কেজি ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়শের ৬০ ও কচুরমুখির দরও ৭০-৮০ টাকা। এক কথায় ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই বাজারে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।
কাঁচাবাজারে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন সালমা আক্তার। রিকশাচালক স্বামীর আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম অবস্থা তাঁর। এই গৃহবধূ বলেন, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব কিছুর দাম বেড়েছে। কোনোটির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমান সরকার কাছে এই বিষয়ে নজর দেওয়ার দাবি জানান।
এ বাজারের বিক্রেতা শেখ তলিফ বলেন, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। কয়েকটি জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে অনেক সবজির বাগান নষ্ট হয়ে গেছে। তাই কাঁচামরিচসহ সবজির দরও বাড়তির দিকে। আরেক সবজিবিক্রেতা ইলিয়াছ শেখের ভাষ্য, ‘পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কেনার পর খাজনা ও পরিবহন খরচ হয়। লাভ রেখে তারপরে তো বিক্রি করব! শীত মৌসুম না হওয়ায় সবজির বাড়তি দাম যাচ্ছে।’
সরদার এন্টারপ্রাইজে পাইকারি সবজি বিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন বলেন, কিছু সবজি অতিরিক্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়াই এর কারণ। মাসখানেকের মধ্যে শীতকালীন সবজি ওঠা শুরু হলে দাম কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন।
আড়তদার শেখ আসাদ বলেন, খুলনা থেকে পাইকারি দরে কিনে আড়তে রাখেন পণ্য। পরে খুচরা বাজারের পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। তারা শুনেছেন, বন্যাসহ প্রাকৃতিক কারণে উৎপাদন অনেক কমে গেছে। ফলে দামও বাড়ছে।
এসব কথায় অবশ্য সন্তুষ্ট নন আমিনুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা। তিনি বলেন, দেশে সাধারণ মানুষের ওপরই যত খড়্গ। সংকট থাকতেই পারে, কিন্তু দাম এভাবে বাড়বে কেন? এর জন্য সিন্ডিকেটকে দায়ী করে তিনি বলেন, এখন তো নতুন সরকার। চাইলেই যেকোনো সময় সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভালো থাকার জন্য তারা কিছুই করছে না।
অপরদিকে মা ইলিশ রক্ষায় সমুদ্রে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজারে সাগরের মাছের সরবরাহ কমেছে। সেই সুযোগে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাছের দর চড়া। রুই, কাতলা, মৃগেল আকারভেদে ৩০০-৫০০ টাকায় কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে। টেংরা মাছ, হরিণা চিংড়ি, চামি চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার কেজি ১২০ থেকে ২৮০ টাকা পর্যন্ত। চাষের কৈ ২০০-২৫০ টাকা, শোল ৩০০-৬০০ টাকা, টাকি ২০০-৩০০ টাকা, রুপচাঁদা ৬০০-৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছ কিনতে আসা মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমরা আয়ে মধ্যবিত্ত। সন্তানদের মুখে আমিষ তুলে দেওয়ার জন্য পাঙাশ মাছ কিনি। কিন্তু সেই পাঙাশ মাছের দামও বেড়েছে কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তেলাপিয়া ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম চাচ্ছে। এভাবে মাছের দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের কপালে আর আমিষ জুটবে না।’
দাম বাড়ার জন্য মাছবিক্রেতা মো. বাবু দায়ী করেন সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞাকে। পাশাপাশি তিনি বলেন, কয়েক দফায় ঘের ভেসে গেছে। মাছ মরেও উৎপাদন কমেছে। ফলে সরবরাহ কমায় দাম বেড়েছে।
এদিকে চালের দামও বেড়েছে ৫-১০ টাকা করে। বুলেট ও স্বর্ণা বুলেট (হাইব্রিড মোটা ধানের অটো রাইস মিলের চাল) প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকায়। চিকন চালের দাম প্রকারভেদে ৬০-৯০ টাকা। বাজারে স্থানীয় মোটা চাল ও ভোজন চালের (দেশি বোরো ধানের চাল) সংকট দেখা দিয়েছে।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরসহ পশুর ও বলেশ্বর নদীতে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এর আওতায় থাকছে সুন্দরবনের নদী-খালও। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও নৌবাহিনী কাজ করবে। তাদের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
বাজারদর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় রাখতে বাজার মনিটরিং টাস্কফোর্স গঠন করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ তথ্য জানিয়ে সংস্থাটির জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজারে অভিযান চালাচ্ছি। কোথাও অসংগতি ও অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’











































