বাগেরহাট প্রতিনিধি।।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম বাগেরহাট। উপকূলীয় এ জেলার সর্বদক্ষিণে সুন্দরবন-সংলগ্ন উপজেলা শরণখোলা। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেসে যায় গ্রামের পর গ্রাম। ২০০৭ সালে সিডরেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা এটি।
সব মিলিয়ে এবং স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে প্রমত্তা বলেশ্বরের তীরে শুরু হয় ৬২ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি, জমি হারাতে হবে না– এমন আশায় বুক বাঁধেন উপকূলবাসী। তাদের আশার সেই বাঁধে ভাঙন ধরেছে।
গত বুধবার সকালে উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের গাবতলা আশার আলো মসজিদ থেকে ডিএস-৭ স্লুইসগেট পর্যন্ত ২০০ ফুট রিং বাঁধ এবং মূল বাঁধের নিচে বেশ কিছু সিসি ব্লক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিলীন হয়েছে অন্তত ১০ একর ফসলি জমি। এ অবস্থায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাঁধের বাইরে থাকা অর্ধশত পরিবার ও শত একর জমি। শত আশার বাঁধটি চোখের সামনে নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম দেখে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তারা বলছেন, বাঁধ নির্মাণের শুরু থেকেই ছিল নানা অনিয়ম। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে বালু এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, সঠিক তদারকির অভাবে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নদী থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু তোলার কারণেও বাঁধে ঝুঁকি বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ পোল্ডারের শরণখোলা-মোরেলগঞ্জে ৬২ কিলোমিটার বাঁধ উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি-১) মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি শুরু করে টেকসই বাঁধের কাজ। তিন বছরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হতে লাগে প্রায় সাত বছর। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তিন দফা কাজের মেয়াদ বাড়ানোর পর সম্প্রতি বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাঁধটি পাউবোর কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। হস্তান্তরের আগমুহূর্তে ভাঙনের ফলে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভাঙন রোধে এরই মধ্যে পাউবো জিও ব্যাগে বালু ভরে ডাম্পিং শুরু করেছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে, এমন আতঙ্ক বাড়িয়েছে বলেশ্বর তীরে। তাতে জলোচ্ছ্বাস হলে বিপদ আসন্ন বলে জানান স্থানীয়রা। হেমায়েত হাওলাদার, শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাড়ির পূর্বদিক দিয়ে বয়ে গেছে প্রমত্তা বলেশ্বর। যার এক পাশে বাগেরহাটের শরণখোলা, অন্য পাশে পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলা। তিনি বলেন, ‘নদী তো আমাগো সবই নিয়া গেল। নদী ছিল কত কিলো দূরে! ভাঙতে ভাঙতে এইহানে আইছে। আমাগো সব জমিজায়গা গেছে। এবার বাঁধ গেলি তো সবাইর ডুবে মরতি হবেনে।’
হেমায়েত হাওলাদারের মতো আতঙ্কে দিন কাটছে শরণখোলার সাউথখালী ইউনিয়নের গাবতলাসহ নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর কয়েক হাজার মানুষের। স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা বারেক হাওলাদার বলেন, ‘নদীভাঙনে কয়েকবার আমার জমি ভেঙেছে। এবারের ভাঙনে আমার পরিবারের প্রায় ছয় একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদী শাসন না হলে এই এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।’
সরকারের কাছে নদী শাসন করে তাদের রক্ষার দাবি জানান আকলিমা বেগম। তিনি বলেন, ভাঙনের ফলে সাউথখালীর অনেকেই ভূমিহীন হয়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। বলেশ্বর তাদের শেষ করে দিয়েছে। স্থায়ী নদী শাসনের দাবি জানিয়েছেন সাউথখালী ইউপি চেয়ারম্যান ইমরান হোসেন রাজীব। তিনি বলেন, ভাঙন ধীরে ধীরে তীব্র আকার ধারণ করছে। মূল বাঁধের নিচ থেকে প্রায় ২০০ ফুট ধসে গেছে। এ ছাড়া বিশাল এলাকায় ফাটল ধরেছে। গাবতলা বাজার থেকে বাবলাতলা প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
পাউবো বাগেরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, ভাঙন রোধে বৃহস্পতিবার থেকেই বালু ভরে জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করা হয়েছে। নতুন করে আর না ভাঙলেও গাবতলার ওই অংশের বাঁধ এখন ঝুঁকিতে আছে। যে কোনো সময় ভাঙতে পারে। এ পরিস্থিতিতে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সিইআইপি প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সি আসাদুল্লাহ বলেন, প্রতিনিয়ত নদী তার গতিপথ বদলাচ্ছে। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে কিছুটা ভাঙন-ঝুঁকি থাকে। সেক্ষেত্রে ভাঙনকবলিত স্থানে দ্রুত সময়ের মধ্যে জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যথাসময়েই বাঁধ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।











































