স্টাফ রিপোর্টার।।
জাতীয় নির্বাচনে ভোটে লড়ার প্রবল আগ্রহ। তাই কোনো উপলক্ষ পেলেই হলো- রংবেরঙের ব্যানার-ফেস্টুনের ঝড় তোলেন এলাকায়। রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক যে অনুষ্ঠানই হোক না কেন, চলেন সবার আগে। ক্ষমতার গরমে নানা কাণ্ড ঘটিয়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন বারংবার। তিনি খুলনার বটিয়াঘাটা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম খান। সবকিছুতেই সরব সাবলীল থাকলেও একটি বিষয়ে তিনি নীরব নিশ্চল। ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিলেও দেনা মেটানোর বেলায় তিনি নিস্পৃহ। ইসলামী ব্যাংক খুলনা শাখা থেকে নিজের পোলট্রি খামারের নামে ২০১৪ ও ২০১৯ সালে দু’দফায় ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণ তুলেছেন আরও দেড় কোটি। ঋণের টাকা তুলতে বছরের পর বছর তাঁর পেছনে চরকির মতো ঘুরছেন ব্যাংক কর্তারা। এখন রীতিমতো হয়রান তাঁরা। তবু ওই দেনা পরিশোধের প্রয়োজন মনে করছেন না ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা। সুদ-আসলের মিশেলে ব্যাংক এখন তাঁর কাছে পাবে ২৩ কোটি টাকা। এরই মধ্যে গত ডিসেম্বরে আশরাফুল আলম খানের মালিকানাধীন সামিন পোলট্রি কমপ্লেক্স ও সামিন পোলট্রি বিডার্স এবং তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগমের নামে তৈরি খারাবাদ ট্রেডিংকে ঋণখেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। টাকা আদায়ে গেল বছর আশরাফুল আলম খান ও আমেনা বেগমের নামে ১০টি মামলা ঠুকেছে ব্যাংক। প্রায় এক বছর পর এ ফেব্রুয়ারিতে মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
যেভাবে ঋণ ও মামলা: ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অনেক আগে থেকেই পোলট্রি ব্যবসায়ী হিসেবে আশরাফুল আলমের নামডাক। ২০০৪ সালে প্রথমবার ইসলামী ব্যাংক খুলনা শাখা থেকে ৩ কোটি টাকা ঋণ নেন। ২০১০ সালে নেন আরও ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তৈরি করেন বিশাল মুরগি ও গরুর খামার। শখের খামারি হিসেবেও বেশ সুনাম কুড়ান তিনি। তাঁর খামারে অস্ট্রেলিয়ান ইমু, টার্কি, তিতিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ছিল। ২০১৪ সাল থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধে অনিয়মিত হয়ে পড়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান। টাকা আদায় করতে না পেরে ২০১৮ সালেই তাঁর প্রতিষ্ঠান দুটিকে খেলাপি ঘোষণার তৎপরতা শুরু করে ব্যাংক। তখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ পুনঃতপশিল করেন তিনি। পুনঃতপশিলের জন্য ন্যূনতম যে টাকা পরিশোধের কথা ছিল, তাও তিনি দেননি।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ওই বছর খারাবাদ ট্রেডিং নামে হিসাব খুলে আরও দেড় কোটি টাকা ঋণ নেন। এই হিসাব খোলা হয় তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগমের নামে। ঋণের ওই টাকা দিয়ে সামিন পোলট্রি কমপ্লেক্স ও সামিন পোলট্রি বিডার্সের ঋণের কিস্তি জমা দেন। এরপর আর কোনো কিস্তি পরিশোধ করেননি তিনি। ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী গত ডিসেম্বরই তাঁর সবক’টি প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক খুলনা শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কেউ রাজি হননি। তবে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিস্তি পরিশোধের জন্য তাঁকে অসংখ্যবার বোঝানো হয়েছে। তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ঋণ পরিশোধের আর্থিক অবস্থা তাঁর রয়েছে, এ জন্য পোলট্রি খামার ও সম্পত্তি নিলাম না করে টাকা আদায়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ঋণ পুনঃতপশিলের সময় কিস্তি পরিশোধের অগ্রিম যে চেকগুলো তিনি দিয়েছিলেন, এর বিপরীতে ১০টি চেক ডিজঅনার মামলা করা হয়েছে। ব্যাংকের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মোল্লা মাসুম রশীদ বলেন, আইনের প্রতিটি ধাপ মেনেই মামলা হয়েছে। আদালত শুনানি শেষে মামলাগুলো বিচারের জন্য পাঠিয়েছেন।
জাতীয় নির্বাচনে লড়ার ইচ্ছা: আশরাফুলের রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি ছাত্রলীগ দিয়ে। জেলা ছাত্রলীগ, উপজেলা আওয়ামী লীগের পর হয়ে যান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। প্রায় এক যুগ ওই পদে থাকার পর ২০১৫ সালে বটিয়াঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণত ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলায় পদোন্নতি পান নেতারা। তবে তিনি ব্যতিক্রম। এর আগে ২০০৯ সালে বটিয়াঘাটা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তিনি জয়ী হন। ২০১৪ সালে পুনর্র্নিবাচিত এবং ২০১৯ সালে নির্বাচিত হন ভোট ছাড়াই। প্রথম নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন সময় তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। নেতাকর্মীরা জানান, খুলনা-১ আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা থেকে কোনো দিবস এলে তিনি সড়ক, মোড়, পথঘাট শুভেচ্ছা ব্যানারে ভরে ফেলেন।
যা বলছেন আশরাফুল: ঋণ ও মামলা প্রসঙ্গে আশরাফুল আলম খান বলেন, ‘মামলা করেছে বলে শুনেছি। এগুলো কিছু না। কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতপশিলের চেষ্টা করছি। তপশিল হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘করোনার সময় ব্যবসায় মার খেয়েছি। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারিনি। বর্তমানে পোলট্রি সেক্টরের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। মুরগির প্রধান খাবার সয়াবিনের দাম ৩০-৩২ থেকে বেড়ে ৭৫-৭৭ টাকা হয়েছে। ভুট্টা ছিল ১০-১২ টাকা, সেগুলো এখন ৪০ টাকা। উপায় না পেয়ে খামার ছোট করে এনেছি। আগে আমার খামারে সপ্তাহে লাখ লাখ বাচ্চা বের হতো। এখন ৩০-৪০ হাজার পিস বের হয়। শুধু আমি না, সবাই কমবেশি ধরা খেয়েছে।’ ২০২০ সালের মার্চের আগে অর্থাৎ করোনার আগে থেকেই ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে না- ব্যাংকের এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক না।’ এ পর্যন্ত ঋণের কত টাকা পরিশোধ করেছেন জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।










































