মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি।।
সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার জেলে অনুকুল গাইনের শারীরিক অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন। তবে আগের তুলনায় তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি সেই থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাঘের আক্রমণের শিকার অসহায় জেলের পাশে দাঁড়িয়েছেন বনবিভাগ, স্থানীয় লোকজন ও ঢাকার সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম। বনবিভাগ ও গ্রামবাসী অনুকুলকে আর্থিকভাবে সহায়তা করলেও সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম অর্থ সাহায্যের পাশাপাশি করে দিয়েছেন থাকার একটি নতুন ঘর ও জীবিকা নির্বাহের জন্য দিয়েছেন একটি ইজিবাইকও।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের জিউধারা ষ্টেশন কর্মকর্তা মোঃ শাহজাহান জানান, গত ২৭ জানুয়ারী সকালে সুন্দরবনের আমুরবুনিয়া এলাকার সুদীরেরচিলা নামক খালে মাছ ধরতে যান জেলে অনুকুল গাইন (৩০)। খালে চরপাটা জাল দিয়ে মাছ ধরার এক পর্যায়ে অনুকুলের উপর একটি বাঘ আক্রমণ করে। তখন তার চিৎকারে সহযোগী জেলে মাহবুব নৌকায় থাকা কচা (চিকন গাছ) দিয়ে বাঘকে আঘাত করলে বাঘটি অনুকুলকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। পরে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাগেরহাটের মোড়েলগন্জ উপজেলা হাসপাতালে নেয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ওইদিনই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর ওইদিন সন্ধ্যায় মুমূর্ষু ও আশংকাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেই থেকে এখনও পর্যন্ত অনুকুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে বর্তমানে তার শারিরীক অবস্থা আগের তুলনায় ভালোর দিকে।
তিনি আরো জানান, ১৫ বছর আগে মারা যান অনুকুলের বাবা মুকুন্দ গাইন। তারপর বাবার অবর্তমানে একমাত্র মাকে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন হতদরিদ্র অনুকুল। সুন্দরবনে মাছ ধরে চলছিলো মা আর এক ছেলের সংসার। অনুকুলের মা মানসিক ও শারীরিকভাবে চলাচলে অক্ষম হওয়ায় মাছ ধরার পাশাপাশি রান্নাবান্নার কাজও করতে হতো তাকে। অক্ষম মাকে রেখে দূরে গিয়ে কাজ করা ও থাকার সুযোগও নেই অনুকুলের। তাই বাড়ীর পাশের সুন্দরবনের সুদীরেরচিলা খালে মাছ ধরতেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করে বাঘের আক্রমণের শিকার হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য বনবিভাগের পক্ষ থেকে তাকে নগদ ১২ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। তার চিকিৎসার জন্য গ্রামবাসীও সহায়তা করছেন। এছাড়া ঢাকায় তার চিকিৎসার ব্যয়সহ সব সময় খোঁজ খবর রাখছেন যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মহসিন উল হাকিম। তিনি অনুকুলের থাকার জরাজীর্ণ ঘর ও অচল মায়ের কথা শুনে তাদেরকে নতুন একটি কাঠ-টিনের ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। সেই সাথে অনুকুলের অসহায় বিধবা পিসি (ফুপু) গীতা রানীকেও (৬০) একটি নতুন ঘর করে দিয়েছেন সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম। গীতা রানীরও স্বামী শশোদার মন্ডল মারা গেছেন ২০ বছর আগে। গীতা রানী একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়ে থাকতেন একা ঝুপড়ি ঘরে। সুন্দরবনে কাকড়া ধরে, অন্যের বাড়ী কাজ করে ও হাটে-বাজারে শাক বিক্রি করে খেয়ে না খেয়ে জীবন চলে গীতা রানীর। তাতে একবেলা খাবার জুটলেও দুইবেলা থাকতে হতো না খেয়ে। আর গীতা রানীর ওই করুন পরিস্থিতি দেখে তাকেও একটি ঘর নির্মাণ করে দেন সাংবাদিক মহসিন। মহসিন উল হাকিম মঙ্গলবার বিকেলে অনুকুল গাইন ও গীতা রানীকে নতুন ঘর দুইটি উপহার দেন এবং তাদের খোজ খবর নেন।

বন কর্মকর্তা মোঃ শাহজাহান আরো বলেন, সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম বিভিন্ন সময়ে জেলে-বাওয়ালীরাদেরকে নানাভাবে সহায়তা করে আসছেন। শীতে কম্বল দেয়া, ঝড়-বন্যায় ত্রাণ দেয়া ও আত্মসমর্পণকৃত সাবেক দস্যু পরিবারকেও চাকুরিসহ নানা কর্মে দিয়ে স্বাবলম্বি করে তুলেছেন। তিনি সুন্দরবন এলাকার মানুষের কাছে একজন প্রিয়জন, বন্ধু ও পরোপকারী হিসেবে পরিচিত। তার নাম শুনলে ছুটে আসেন সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালীরা। কারণ বিভিন্ন সময়ে তার ভালবাসা ও সাহায্য সহযোগিতায় অনেকেরই ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে।
নতুন ঘর পেয়ে বিধবা অসহায় গীতা রানী বলেন, আমি সাংবাদিক মহসিনের জন্য আমৃত্যু আর্শীবাদ করবো, কারণ ঝুপড়ি ঘরে শীতে, বৃষ্টি থাকতে কষ্ট হতো। খাই আর না খাই এখন শান্তিতে তো ঘুমাতে পারবো। গীতা রানী আরে বলেন, গোনে সুন্দরবনে কাকড়া ধরে ৫০/১০০টাকা হয়, কখন হয়ও না। গোন ছাড়া গ্রাম থেকে শাক তুলে হাটে বিক্রি করি। তাতে ১শ দেড়শ টাকা হয়। তা দিয়ে চাল, আলু কিনে খাই। একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড ছিলো ছয় মাস হলো আমার নাম কেটে তাও বাদ দিয়ে দিয়েছে মেম্বর-চেয়ারম্যান। এখন কিভাবে চলবো, কি খেয়ে বাঁচবো। যদি কেউ খাওয়ার ব্যবস্থাটা করে দিতে তাহলে ভাল হতো। একবেলা খেলে আর দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। না খেয়ে থাকতে দেখে আশপাশের লোকজন এক দুই বেলা খেতে দেয়। এভাবে কয়দিন চলবো।
যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মহসিন উল হাকিম বলেন, বিবেক ও মানবতার জায়গা থেকেই নিজ সাধ্যমত বাঘের আক্রমণের শিকার অনুকুল এবং বিধবা অসহায় গীতা রানীকে থাকার মত দুইটি নতুন ঘর করে দিয়েছি মাত্র। আর অনুকুলের শারীরিক যে অবস্থা তাতে সে বাড়ী ফিরে সহসা কাজ করতে পারবেনা। তাই নিজে চালাতে না পারলেও অন্তত ভাড়া দিয়ে হলেও যাতে তার সংসারটা চলে সেজন্য একটি ইজিবাইক কিনে দিয়েছি। আপাতত ইজিবাইকটি অনুকুলের সহযোগী জেলে মাহবুব ভাড়া চালিয়ে আয়ের টাকা অনুকুলের পরিবারকে দিবেন। তাতে দুই পরিবার খেয়ে পরে চলতে পারবেন।









































