খুলনাঞ্চল ডেস্ক।।
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন এ বছরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগেই পদত্যাগ করছেন। এর কারণ হিসেবে বলেছেন, তিনি পরিশ্রান্ত এবং নেতৃত্ব দেবার মতো তার “যথেষ্ট শক্তি নেই।” তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো যখন জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, আগামী ১৪ই অক্টোবর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাতে তার দল লেবার পার্টির পুনরায় জয়লাভের সম্ভাবনা কম।
আরডার্ন তার ছয় বছরের “চ্যালেঞ্জিং” শাসনকালের বর্ণনা দেওয়ার সময় আবেগে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। লেবার পার্টির এমপিরা আগামী রোববার তার উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন।
৪২ বছর বয়সী জেসিন্ডা আরডার্ন বলেছেন, তার ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি সময় নিয়েছেন। প্রচুর চিন্তাভাবনা করেছেন। তিনি আশা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তিন হয়তো তার প্রাণশক্তি ফিরে পাবেন।
আজ বৃহস্পতিবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমি সেটা পাইনি, এবং আমি যদি আমার কাজ অব্যাহত রাখি তাহলে আমি নিউজিল্যান্ডের ক্ষতি করবো।
আরডার্ন ৭ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে তার পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। লেবার পার্টির এমপিরা যদি এর মধ্যে তার উত্তরসূরি নির্বাচন করতে না পারেন, তাহলে পার্টির সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবেন।
জেসিন্ডা আরডার্ন ২০১৭ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, তখন তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী নারী সরকার প্রধান। সেসময় তার বয়স ছিল মাত্র ৩৭ বছর।
দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পরেই এক সন্তানের জন্ম দিয়ে তিনি হন বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যক্তি যারা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মা হয়েছেন। এর আগে ১৯৯০ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে কিছু কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। কোভিড মহামারির দুর্দিন এবং আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে তিনি নিউজিল্যান্ডের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সময়েই ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলা এবং হোয়াইট আইল্যান্ডে আগ্নেয়গিরির বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে।
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটো মসজিদে এক শ্বেতাঙ্গ হামলাকারীর গুলিতে ৫০ জনেরও বেশি নিহত হয়। নিউজিল্যান্ডের মতো একটি দেশে এই হামলার ঘটনা সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল।
হামলায় যারা নিহত হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন মাথায় স্কার্ফ পরে তাদের পরিবারের কাছে ছুটে যান। তার এই সহানুভূতিশীল মনোভাবের কারণে তিনি সবার কাছে প্রশংসিত হন।
আরডার্ন বলেছেন, তার জীবনের গত সাড়ে পাঁচ বছর ছিল “বেশ সন্তোষজনক,” তবে “সঙ্কটের” সময় দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কঠিন ছিল। “এসব ঘটনা এতো বড়ো ছিল এবং এগুলোর যে ধরন, তার জন্য মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু এরকম মুহূর্ত কখনও আসেনি যখন মনে হয়েছে যে আমরা নেই,” বলেন তিনি।
জেসিন্ডা আরডার্ন সারা বিশ্বে একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক তারকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেও, জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে দেশের ভেতরে তিনি ক্রমশই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন।
তার সরকার যেভাবে কোভিড মহামারি মোকাবেলা করেছে, তাকে পুঁজি করে তার নেতৃত্বাধীন দল লেবার পার্টি ২০২০ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছে। এবং তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
কিন্তু সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এখন তার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে কম।
একই সঙ্গে তার দলের জনপ্রিয়তাও হ্রাস পেয়েছে। আরডার্ন ২০২২ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তার সরকার কোভিড মহামারির সময় লোকজনকে নিরাপদ রাখতে যেসব ব্যবস্থা নিয়েছেন, তার জন্য তার জনপ্রিয়তা কমে গেছে।
একই সঙ্গে জীবনযাত্রার মূল্যবৃদ্ধি, অপরাধ, এবং মহামারির কারণে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারাও এর কারণ।
তার এই ঘোষণায় নিউজিল্যান্ডে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। তার নিজের নির্বাচনী এলাকার একজন এনজেড হেরাল্ড পত্রিকাকে বলেছেন, “তাকে ছুঁড়ে ফেলার আগেই তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন।”
অপরাধমূলক ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির জন্য তিনি তাকে দায়ী করেছেন। আরেকজন বলেছেন, “নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীদের একজন” তিনি।
একজন বলেছেন তাদের প্রধানমন্ত্রী “নারী-বিদ্বেষের” শিকার হয়েছেন। তবে আরডার্ন জোর দিয়ে বলেছেন, তার ও তার দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার কারণে তিনি পদত্যাগ করছেন না।
“নির্বাচনে আমরা জিততে পারবো না- এটা ভেবে আমি সরে দাঁড়াচ্ছি না। আমি সরে যাচ্ছি কারণ আমি বিশ্বাস করি আমরা জিততে পারবো এবং জিতবো, এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আমাদের নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন,” বলেন তিনি।









































