ঢাকা অফিস।।
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুঃসাহস ও উদ্ধত আচরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
জঙ্গল সলিমপুরকে রাষ্ট্রের ভেতরে ‘আরেকটি রাষ্ট্র’ অভিহিত করে তিনি বলেন, “বিগত সরকারের সময় আইনের শাসন না থাকায় জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রের ভেতর আরেকটা রাষ্ট্র তৈরি করেছিলেন। আমরা খুব গভীরভাবে দেখেছি এবং এর উপরে আমরা অ্যাকশন নিচ্ছি সেটা আপনাদের সামনে যখন দৃশ্যমান হবে, আপনারা দেখতে পাবেন।”
পুলিশ সদরদপ্তরের কন্ট্রোল রুম পরিদর্শন শেষে মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সরকারের কঠোর বার্তা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলাম। ওখানে একটা যৌথ অভিযান চলেছে। অনেক অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। অনেক দাগি আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে।”
রোববার গভীর রাতে মূল সড়কের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ত্রিমুখী হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি চালানোর পাশাপাশি নির্মাণাধীণ একটি ক্যাম্প তারা ভেঙে দিয়েছে।
সেখানকার দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় লোকজন ও ক্যাম্প নির্মাণের কাজে সম্পৃক্ত শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ট্রাকে করে এক্সক্যাভেটর নিয়ে আসে সন্ত্রাসীরা পেছনে মোটর সাইকেলে করে তাদের লোকজন আসে। তারাই আলী নগর স্কুলের পূর্ব, পশ্চিম পাশ এবং দক্ষিণ পাশ থেকে হামলা শুরু করে। ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গুলিও ছোড়ে তারা।
র্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান এ ঘটনার জন্য জঙ্গল ছলিমপুরের ‘অধরা নিয়ন্ত্রক’ ইয়াছিন বাহিনীকে দায়ী করেছেন।
এ ঘটনায় ৩০০ জনকে আসামি করে মামলাও করেছে পুলিশ।
প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিঙ্ক রোড দিয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা দুর্গম স্থান এই ছলিমপুর।
স্থানীয় লোকজনদের ভাষ্য, ২০০২-০৩ সাল থেকে সেখানে বসতি শুরু হয়। জঙ্গল ছলিমপুরের পুরো ছিন্নমূল এলাকাকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয়েছে ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য।
চলতি বছর ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল ছলিমপুরে অভিযানে যায়। সেখানে ‘মাইকে ঘোষণা’ দিয়ে র্যাব সদস্যদের ঘিরে তিনজনকে আটকে ফেলে স্থানীয়রা। তাদের পিটুনিতে নিহত হন র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
এরপর গত ৯ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তিন হাজারের বেশি সদস্যকে নিয়ে সেখানে অভিযানে যায় স্থানীয় প্রশাসন। তখন বেশ কয়েকজনকে ধরা হলেও ‘সন্ত্রাসীদের হোতা’ ইয়াছিন ছিলেন অধরা।
অভিযানের পরপরই সেখানে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করার তথ্য দিয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি ও র্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ বলেছিলেন, “সেখানে পুলিশ ও র্যাব মিলে ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আশাকরি পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।”
‘এখনই পরিকল্পনা ফাঁস করতে চাই না’
জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সেখানে আমরা যখন ঘোষণা করেছি যে পুলিশ একাডেমি করা হবে, র্যাবের জন্য একাডেমি করা হবে এবং আমাদের ক্রীড়া পুলিশ বাহিনী ক্রীড়া কমপ্লেক্সসহ অন্যান্য বাহিনীর বিজিবির এবং এপিবিএন একাডেমি করব। চট্টগ্রাম জেলা কারাগার স্থানান্তর হওয়ার কথা আগে থেকেই এই জায়গাটায় একটা প্রশাসনিক এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা বাহিনীর একটা হাব ট্রেনিং সেন্টার হয়ে উঠবে।
“সেই জায়গাটায় যে সন্ত্রাসীরা তাদের যে আড্ডা ছিল সেটা আবার রাখতে পারে সেজন্য চেষ্টা। তবে সন্ত্রাসীরা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে। সেটা খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করব। এখনই পরিকল্পনা ফাঁস করতে চাই না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সন্ত্রাসীদের অবয়ারণ্য যেখানেই থাকুক সেগুলো নির্মূল করা হবে। আমরা আশা করি আপনারা সবাই সহযোগিতা করবেন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আশা করি আমাদের সেই উদ্যোগকে সমর্থন করবেন এবং সহযোগিতা করবেন। আমরা এই দেশে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী মাদক ব্যবসায়ী এবং চাঁদাবাজি এগুলোর কোন স্থান দেব না। এই ব্যাপারে আমরা জিরো কাছে আছি।
“সমস্যার সমাধান করতে গেলে কিছু আমাদের যান্ত্রিকভাবে প্রকৌশলগতভাবে আমাদের কিছু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।”
অসাবধানতার সুযোগ নিয়েছে কেএনএফ: র্যাব মহাপরিচালক
বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) তথা ইয়াসিন বাহিনীর অতর্কিত হামলার পেছনে র্যাবের কিছুটা ‘অসাবধানতা ও গোয়েন্দা নজরদারির দুর্বলতা ছিল’ বলে জানিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ।
তার ভাষ্য “এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কোনোভাবেই র্যাবের চেয়ে শক্তিশালী নয় এবং পাহাড়ে তাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হবে।”
মঙ্গলবার জাতীয় ঈদগাহের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মহাপরিচালক বলেন, “আপনারা জানেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্বে থাকাকালীন এই সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশনে আমি নিজে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছি। বর্তমানে পাহাড়ে র্যাব ও পুলিশের দুটি বিশেষ ক্যাম্প সার্বক্ষণিক ও অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছে।”
৯ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তিন হাজার ১৮৩ জন সদস্যকে নিয়ে জঙ্গল ছলিমপুরে অভিযানে গিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৪৮৭, বিজিবি ১২২ জন, র্যাবের ৩৭১ জন সদস্য ছিলেন। তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, ডগ স্কোয়াড, ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয় সেই অভিযানে।
অভিযানের পর আলী নগর স্কুলে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। যেখানে পুলিশ, এপিবিএন, আরআরএফ, র্যাবের শতাধিক সদস্য অবস্থান করেন। আলী নগর স্কুল থেকে কয়েকশ গজ দূরে পূর্ব দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আলাদা একটি ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই কাজই করছিলেন ওই শ্রমিকরা।
মূলত র্যাবের ‘মূল ক্যাম্পে কোনো হামলা হয়নি’ জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, “ওই দুর্গম এলাকায় আমরা নতুন একটি ক্যাম্প স্থাপন করে স্থায়ীভাবে বসার (সেটেলড হওয়ার) উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমাদের সেই অপ্রস্তুত নতুন ক্যাম্পটির ওপরই তারা অতর্কিত হামলা চালায়।”
র্যাবের কোনো গাফিলতি ছিল কী না জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তারা মূলত অতর্কিতভাবে কাজটি করেছে। আমার মনে হয়, এখানে আমাদেরও কিছু অসাবধানতা ছিল, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
“আমরা হয়ত তাদের কার্যক্রমটা সেই লেভেলের মনিটরিং বা নজরদারিতে রাখতে পারিনি।”
এই হামলা নিয়ে মহাপরিচালক বলেন, “আমাদের পরাস্ত করার মত শক্তি তাদের নেই। এটা তারা নিজেরাও খুব ভালো করে জানে। আমাদের কিছুটা অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে তারা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। কিন্তু তারা আর পার পাবে না।
“তারা যেখানেই থাকুক, যেভাবে থাকুক তাদের আমরা পাহাড় থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করবো।”
এই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
“তারা আর সেখানে মাথাচাড়া দিতে পারবে না। আমরা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছি এবং তারা তাড়ানো অবস্থাতেই থাকবে। নতুন করে কোনো শক্তির সেখানে ঢোকার সুযোগ নেই।”









































