Home কলাম আটচল্লিশ ঘন্টার কূটনৈতিক সাফল্য

আটচল্লিশ ঘন্টার কূটনৈতিক সাফল্য

27

বাপি সাহা
অনেকটা অপ্রতাশিতভাবে খবরটি এলো মিডিয়ার মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বিরতির খবরটি। অপ্রতাাশিত হলেও স্বস্তির খবর। মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন না করলেই নয় কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও যে অবদান রেখেছেন সেটি কিন্তু যথেষ্ট প্রশংসার দাবী রাখে। রাতভর আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে ট্রুথ সোশ্যালের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাত বিরতির প্রথমবার্তা দেন। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রী বিক্রম মিশ্রি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বলেন, “ভারতীয় সময় বিকাল ৫:০০ টা থেকে এই যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়েছে।” পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সেটি নিশ্চিত করেছেন। শনিবার এক্স হ্যান্ডেলে এ কথা জানান ইসহাক দার। ২০ জানুয়ারী ২০২৫ ক্ষমতাগ্রহণের পরবর্তী পর্যায়ে এটি একটি বড়ধরণের সাফল্য। অভিনন্দন মার্কিন প্রশাসন ও মার্কিন জনগণের প্রতি। মার্কিন নেতৃত্বে এটি একটি বড় ধরণের সাফল্য যা ইতিহাস হয়ে থাকবে। গত ২০ জানুয়ারী ২০২৫-এ ক্ষমতা গ্রহণের পরবর্তী পর্যায়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল মার্কিন প্রশাসন। দুই দেশের বেসামরিক জনগণ একটি নিশ্চিত অনিশ্চয়তার হাত থেকে মুক্তিপেল। এই যুদ্ধ বড় ধরণের প্রাণহানী থেকে রক্ষা করেছে বিশ^কে। দ্বিধা বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে বিশ^কে। ট্রাম্প প্রশাসনের দায়িত্ব রত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট-্এর নেতৃত্বে এই সফলতাটি এসেছে । এই সংঘাতের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি যেমন নষ্ট হতো ঠিক তেমনি ভাবে সার্ক-এর পথ চলাও কঠিন হয়ে যেত। সারা বিশ^ একটি অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা পেল।

আমার পক্ষে মার্কিন মুলুকে গিয়ে এই ধন্যবাদ জানানোর ক্ষমতা আমার নেই কিন্ত মিডিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই। এই সংঘাত নিয়ে সাধারণ মানুষ কিন্তু অনেক উৎকন্ঠার মধ্যে ছিল। পাহেলগাঁর একটি ঘটনা যা শোকাবহ কিন্তু দুটি দেশকে অস্থির করে তুলেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতির মূল আলোচনার বিষয় ছিল। পাকিস্তান-ভারতের সীমান্তের উত্তেজনা এ অঞ্চলের মানুষকে সবসময় ভাবিয়ে তোলে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি-এর সফরটি ও কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার সময় সংকটনিরসনের প্রতি অনুরোধ তাঁর অনুরোধ ছিল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনার এক পর্যায়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই চলমান পরিস্থিতি যেন কঠিন না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে বা দ্রুতব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।” এই সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা কিন্তু প্রশংসার দাবী রাখে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও মার্কো রুবিও টানা আটচল্লিশ ঘন্টার ফসল তুলেছেন ফলপ্রসু আলোচনার মাধ্যমে। তারা যে যথেষ্ট কাজ করেছেন সেজন্য কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়। যোগাযোগটা ছিল সর্বক্ষণিক পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস,জয়শঙ্কর-এর সাথে এবং পরিস্থিতির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন। বিশ^ নেতৃবৃন্দ শংকায় ছিলেন এই সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের প্রাণহানী নিয়ে। যুদ্ধ বিরতির পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তান তার আকাশ পথ মুক্ত করে দেয়। খবরটি পাওয়ার সাথে সাথে জম্মু -কাশ্মীরে সাধারণ জনগণ উল্লাস প্রকাশ করে। কিছুদিন আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট-এর ভারত সফরটিও কিন্তু অনেক গুরুত্ব বহন করে। মার্কিন কূটনীতিতে এটি বড়ধরণের সাফল্য বলে মনে করাই যেতে পারে।

মার্কিন রাজনীতিতে কিছু পরিবর্তন মনে হয় আসতে চলেছে সেটি একটু না বললে নয় সেটি হচ্ছে কর সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং চীনের সাথেও জেনেভাতে আলোচনার যাত্রা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশকেও এখন উদ্যোগ নিতে হবে। কিচুটা ভিন্ন প্রসঙ্গে যেতে হবে কারণ আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমাদের পোশাক শিল্পকে যেভাবে হোক রক্ষা করতে এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে কারণ সবার আগে দেশ। দেশের জনগণ ভাল থাকলে আমরা সকলে ভাল থাকবে।

যে অবস্থাটি তৈরি হয়েছিল এই দুইদেশের সংঘাতকে কেন্দ্র করে সেটি কিন্তু অনেক মর্মান্তিক। দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন যাপনা অনেকটা কঠিন ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। নারী ও শিশুদেও নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্নছিল সাধারণ জনগণ। পাঞ্জাব অঞ্চলটিতে এই সময়ে গম কাটার সময় চলছে এলাকার পুরুষরা এখন ব্যস্ত রয়েছে গম কাটা নিয়ে ভয় কিন্ত কাজ করছে তাদেও ভিতর। দুঃসহ জীবন যাপন করতে হয়েছে সীমান্তের বাসিন্দাদের। সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষেরা প্রাণের ভয়ে জীবন-যাপন করতে সংঘাতময় এই দিনগুলিতে। সংঘাত কখনই সমাধান আনতে পারে না সেটি কিন্তু প্রমাণিত হলো এবারও।

এই সংঘাত -এর ক্রীড়াঙ্গনেও ছাপ ফেলেছে দুটি দেশে দুটি বৃহৎতম ক্রিকেট লীগ চলমান যেটি স্থগিত করা হয়েছে। অনেক বিদেশি খেলোয়ার ফিওে গেছে তাদের দেশে। এই লীগ গুলি ঘিরে তৈরি হয়ে থাকে অনেক নতুন খেলোয়ার। অনেকে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়ে থাকে। সামনে এশিয়া কাপ। সেটা অনেকটা অনিশ্চিত। ভারত ও পকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের যে সকল খেলাগুলো হবার কথাছিল সেটি হবে কিনা এখন তাকিয়ে থাকতে হবে দুইদেশের সিদ্ধান্তের দিকে। এশিয়াকাপ সহ এই সফরগুলি আমাদের দেশের জন্য অনেক প্রয়োজন ছিল। আমাদের ক্রিকেট ক্যালেন্ডারে অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। খুব দ্রুত যেন সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয় এই প্রত্যাশা আমাদের। খেলাধুলার মাধ্যমেও কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
কাশ্মীর নিয়ে যত বিরোধ: শুরুটা হয় ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত -পাকিস্তান দেশ বিভাগের পরই কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধে জড়িযে পরে। মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ কাশ্মীরের মহারাজা ভারতের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলে এই যুদ্ধ হয়। জাতিসংঘের মধ্যস্থতার মাধ্যমে ১৯৪৯ সালে ১ জানুয়ারি যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান“অপারেশন জিব্রাল্টার”শুরু করে দেশটির সেনারা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীওে অনুপ্রবেশ করলে দুই দেশ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়েপড়ে। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৯৬৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বও যুদ্ধবিরতি শুরু হয়।

১৯৭১ সালে তৎকালীনপূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বেসামরিক জনগণের ওপর নৃশংস আক্রমণ করে। ভারতপূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্মক হামলা শুরু করে এবং ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনী আত্ম সমর্পণ করে।

১৯৮৯ সালে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীর উপতক্যায় সশস্ত্র লড়াই হয়। পাকিস্তানের সমর্থনে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের উত্থানের ফলে সংঘাত বাড়ে। ভারতীয় সেনারা নৃশংস প্রতিক্রিয়া দেখালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক সংঘর্ষ তীব্রতর হয। ১৯৯৯ সালে যুদ্ধটি কার্গিলযুদ্ধ নামে পরিচিত। পাকিস্তানি সেনা ও বিদ্রোহীরা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কার্গিল সেক্টরে অনুপ্রবেশ করে। তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ লাইনব্যাহত করতে কৌশলগত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ভারত অনুপ্রবেশকারীদেও হটাতে “ অপারেশনবিজয়”শুরু করলে তীব্র লড়াই হয়।
২০০১ সালে দিল্লির সংসদে হামলা হয়। সীমান্তযুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে ও সংঘর্ষ হয়নি। ২০২৬ সালে উরিতে সেনাঘাঁটিতে হামলার পর পাকিস্তানের ভূখন্ডে ভারত“অপারেশন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক”পরিচালনা করে। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর বালাকোটে বিমান হামলা কওে ভারত। পাকিস্তান ও জড়িয়ে পড়ে যুদ্ধে।
গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীওে হামলার জেওে পাকিস্তান “ অপারেশন সিঁদুর”পরিচালনা করে ভারত। হামলায় ৭০জন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার দাবি করে ভারত। অন্যদিকে পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় ১০ জন নিহত। হামলা এবং পাল্টাহামলা চলছিল এবং হতাহতেরসংখা বেড়েই চলছিল। পাকিস্তান তার অভিযানের নামকরণ করেন‘‘বুনইয়ান -উন-মারসুর। আমরা সকল প্রকার যুদ্ধের বিরুদ্ধে। শান্তিময় হোক এই পৃথিবী এই প্রত্যাশা সকল সময়।

লেখক: উন্নয়নকর্মী